বিতর্কিত আবু জাফরকে ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি নিয়োগে তোড়জোড়

আবু জাফর
দুর্নীতি, অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ বিতরণের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান চলমান। এর মধ্যেই প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আবু জাফরকে ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি ও সিইও করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তার নিয়োগে সম্মতি দিয়ে অনুমোদনের জন্য এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
ব্যাংক খাত যখন খেলাপি ঋণ, অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তখন দুদকের অনুসন্ধানের মধ্যে থাকা একজন সাবেক ব্যাংক এমডিকে আরেকটি সংকটাপন্ন ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যায় থাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় নতুন নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে শনিবার রাতে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মেলিতা মেহজাবীনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সাড়া এবং বিষয়টি নিয়ে এসএমএস দেওয়ার পরও কোনো জবাব দেননি।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের এমডি থাকাকালে আবু জাফরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের জব্দ ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ইকবালের ফ্রিজ হিসাব থেকে ১ কোটি ১১ লাখ টাকা ও ৩০ হাজার মার্কিন ডলার উত্তোলনের ঘটনায় আবু জাফরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং বিভিন্ন গ্রাহকের অনুকূলে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ বিতরণের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
দুদকের ১৬ এপ্রিল জারি করা একটি নোটিসে বলা হয়, আবু জাফরের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী শাখা থেকে কয়েকটি ফ্রিজ করা হিসাবের অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নির্বাহীদের বক্তব্য নেওয়াকে প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করা হয়।
আবু জাফরের প্রিমিয়ার ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ হওয়ার ঘটনাটিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি ব্যাংকটির এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি ঢাকা ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
তবে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে তিনি ছুটিতে ছিলেন। পরে প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তার সঙ্গে করা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের পর ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তার চুক্তি বাতিল কার্যকর হয়।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতির ভিত্তিতেই ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
এরপরই ন্যাশনাল ব্যাংকের শীর্ষ পদে আবু জাফরকে নেওয়ার উদ্যোগ সামনে এসেছে। ব্যাংকের পর্ষদ তাকে এমডি ও সিইও হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে। নিয়োগের প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। অথচ ন্যাশনাল ব্যাংক নিজেও দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংকটির নতুন এমডি হিসেবে এমন একজনকে বেছে নেওয়া হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান— বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই নিয়োগের গ্রহণযোগ্যতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।





