সম্পাদকীয়
এখনো গলার কাঁটা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভিসা একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সেবা। এটি কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, নয় কোনো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর ব্যবসার ক্ষেত্রও। অথচ বাংলাদেশে বিদেশগামী মানুষের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই এক অসহনীয় দুর্ভোগের নাম। প্রযুক্তির উৎকর্ষ, ডিজিটাল সেবার বিস্তার এবং কাগজবিহীন প্রশাসনের যুগেও যদি সাধারণ মানুষকে ভিসা পেতে দালাল, সিন্ডিকেট কিংবা অতিরিক্ত অর্থের ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই সঙ্গে অ্যানালগ যুগের গলাকাটা পাসপোর্টের মতো ভিসা জালিয়াতির শিকারও হতে হয়— তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়; এটি নাগরিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
গতকাল শনিবার আগামীর সময়-এ প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এমন কিছু ঘটেছে, যা গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের আলোচিত ‘গলাকাটা’ ভিসা প্রতারণার নতুন সংস্করণ! এই উন্নত-অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সময়ে ঠিকানা, ছবি কিংবা বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে অন্যের সঙ্গে মেলার কোনো সুযোগ নেই। অথচ সেই পাসপোর্টেই ভিসা নিয়ে এক প্রতারকচক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে একশ্রেণির মানুষ। বিপরীতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন নিরীহ, নিরপরাধীরা। এ এক আশ্চর্যজনক প্রতারণা!
মানব পাচারে পাসপোর্ট জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং একাধিক দেশের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার দুর্বলতা। ভয়ংকর এ জালিয়াতিতে শুধু বাংলাদেশ নয়, ইতালিসহ বিদেশে থাকা একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্র সক্রিয়। ভিসা আবেদন ঘিরে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত ফি, জালিয়াতির উদ্দেশ্যে পাসপোর্ট আটকে রাখা বা ছিনতাই এবং অসহায় মানুষের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যা চলতে থাকাটা প্রমাণ করে যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হয় সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ, নয়তো কোনো অদৃশ্য স্বার্থগোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
একজনের পাসপোর্টে অন্য ব্যক্তির ছবি, নাম-পরিচয় ও বায়োমেট্রিক কীভাবে ব্যবস্থাপত্রের একাধিক ধাপ পেরিয়ে যায়! বাংলাদেশ থেকে যিনি অন্যের পাসপোর্টে বের হচ্ছেন, তিনি বিদেশের বিমানবন্দরে গিয়ে কীভাবে পার হয়ে যান ইমিগ্রেশন— এসব প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্টরা দ্রুত দেবেন এমন প্রত্যাশা সবার। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু দালাল বা ট্রাভেল এজেন্সির কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হবে না; আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কারা এই চক্রকে সহায়তা করছে— সেটিও খুঁজে বের করতে হবে।
পরিতাপের বিষয় হলো, এ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন মূলত কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক সাধারণ মানুষ। অনেকে জীবনের সঞ্চয় খরচ করে বিদেশে কাজের সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু ভিসা প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার কারণে তাদের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়; এটি দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সুশাসনের দাবিকে দুর্বল করে দেয়। একটি রাষ্ট্র তখনই আধুনিক বলে বিবেচিত হয়, যখন তার নাগরিক সেবা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান দেখা যায় না। কারণ সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। যেখানে দালালচক্র, অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কিছু প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের অশুভ সমন্বয় সৃষ্টি হয়ে আছে, সেখানে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে সুফল আসে না। প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি।
নাগরিককে জিম্মি করে কোনো সেবাব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না। ‘গলাকাটা’ ভিসা সংস্কৃতি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগতিপূর্ণ। তাই এখন আর অজুহাত নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। সরকার, সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, ভিসা সেন্টার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করে এ অনিয়ম আর দুর্নীতির অবসান ঘটাতে হবে। মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ ও মূল্যবান সময় রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।





