বিএনপি সরকারের প্রথম মেট্রো, শিগগিরই একনেকে উঠছে প্রকল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গাবতলী থেকে রাসেল স্কয়ার হয়ে দাশেরকান্দি-রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তকে এক সুতোয় বাঁধার এই মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিকল্পনা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থমকে যায় এর অনুমোদন প্রক্রিয়া। এবার সেই স্থবিরতা কাটিয়ে প্রকল্পটি অনুমোদনের পথে। সব ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উঠবে ১৭ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এ প্রকল্প। আর তা অনুমোদন হলে মেট্রোরেলে বিএনপি সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রাও শুরু হবে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মোকছেদ আলী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে। ওই সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেতে পারে।’
মেট্রোরেল নিয়ে নতুন সরকারের প্রথম বড় পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে এটি। দেশে মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২২ সালে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উত্তরা-কমলাপুরসহ আরও কয়েকটি মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণ ও পরিকল্পনা এগোয়। তবে সময়ের সঙ্গে এসব প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। পুরনো প্রকল্পগুলোর সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলেও তার আগেই নতুন একটি মেট্রোরেল প্রকল্প নিয়ে সামনে এগোচ্ছে বর্তমান সরকার।
প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ)। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত।
মেট্রোর চেয়ে মনোরেলে বেশি আগ্রহ, এবার মেট্রোতেই: বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ে আলোচনায় মেট্রোরেলের চেয়ে মনোরেলই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা বা ইউআরএসটিপিতেও ২০৪৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় পাঁচটি মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। বিপরীতে মেট্রোরেল নিয়ে তেমন উচ্চাভিলাষী নতুন পরিকল্পনা দেখা যায়নি। এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছিল, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় মেট্রোরেল কি পিছিয়ে যাচ্ছে? এবার গাবতলী-দাশেরকান্দি রুটের প্রকল্প অনুমোদনের উদ্যোগ সে প্রশ্নেরই ভিন্ন উত্তর দিচ্ছে। মনোরেলের পরিকল্পনার পাশাপাশি মেট্রোরেলেও নতুন বিনিয়োগে এগোচ্ছে সরকার।
গাবতলী থেকে পাতালপথে, দাশেরকান্দিতে গিয়ে উঠবে ওপরে: ঢাকার ব্যস্ততম কয়েকটি এলাকা পেরিয়ে যাবে এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ)। ডিএমটিসিএলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ। এরপর আফতাবনগর সেন্টার থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ।
অর্থাৎ মোট ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার পথের বড় অংশই থাকবে মাটির নিচে। এ পথে নির্মাণ করা হবে ১৫টি স্টেশন— এর মধ্যে ১১টি পাতাল এবং চারটি উড়াল। রুটটি হবে— গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, রাসেল স্কয়ার, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর পূর্ব, নাসিরাবাদ ও দাশেরকান্দি।
এই রুট চালু হলে ঢাকার পশ্চিম অংশের গাবতলী থেকে শুরু করে শ্যামলী, আসাদ গেট, রাসেল স্কয়ার, কারওয়ান বাজার ও হাতিরঝিল হয়ে পূর্ব ঢাকার দাশেরকান্দির সঙ্গে দ্রুত গণপরিবহন যোগাযোগ তৈরি হবে।
অনুমোদনের পরই কাজ শুরু সরকারি অর্থে: প্রকল্পের অর্থায়নে এখনো এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে পুরো ঋণ নিশ্চিত হয়নি। তবে বিদেশি ঋণের জন্য বসে থাকতে চায় না প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ সরকারি অর্থে করা হবে। ফলে ঋণ পেতে কিছুটা সময় লাগলেও প্রকল্পের কাজ শুরু করতে সমস্যা হবে না।’
প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি অর্থে ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হবে। ডিএমটিসিএল সূত্র বলছে, ভূমি অধিগ্রহণেই সময় লাগতে পারে এক থেকে দেড় বছর। এ সময়ের মধ্যে দরপত্র ও অন্যান্য প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে মূল নির্মাণকাজ। তবে প্রকল্পের সবচেয়ে কঠিন ও সময়সাপেক্ষ অংশ হবে পাতাল মেট্রোর টানেল নির্মাণ।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরও বললেন, ‘টানেল নির্মাণে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। সে কারণে প্রকল্পের শুরুতেই এ কাজ ধরতে হবে।’
ঋণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, তবু প্রস্তুতি এগিয়ে: প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এডিবি তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করছে। এ কারণে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে এজন্য পুরো প্রকল্প আটকে রাখার পরিকল্পনা নেই।
কৌশলটি হলো— আগে সরকারি অর্থে প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু করা, এরপর কাজের অগ্রগতি দেখে বৈদেশিক ঋণের চুক্তি এগিয়ে নেওয়া।
এদিকে প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের দরপত্র-প্রক্রিয়াও অনেকটা এগিয়ে গেছে। ডিএমটিসিএলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রথম চারটি কন্ট্রাক্ট প্যাকেজের চূড়ান্ত দরপত্রের নথি প্রস্তুত করে ডিএমটিসিএলে জমা দেওয়া হয়েছে এবং এডিবির সম্মতিও পাওয়া গেছে।
সিপি-১ ও সিপি-২-এর চূড়ান্ত দরপত্রের নথি ২৮ জানুয়ারি ডিএমটিসিএলে জমা পড়ে। পরে এডিবির সম্মতির জন্য পাঠানো হলে ১০ মে দুই প্যাকেজেই সম্মতি পাওয়া যায়। সিপি-৩ ও সিপি-৪-এর ক্ষেত্রেও নথি জমা ও এডিবির সম্মতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে সিপি-৬ ও সিপি-৭-এর দরপত্রের নথি পর্যালোচনার কাজ চলছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইএসও-জেভি এসব নথি প্রস্তুত করে প্রকল্প কার্যালয়ে জমা দিয়েছে। পরে এডিবি নথিগুলোর প্রাপ্যতা বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। এখন কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের নিয়োগ করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএফএস সেগুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে।
সিপি-৮ ও সিপি-৯-এর চূড়ান্ত দরপত্রের নথিও প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নথি জমা দেওয়ার পর এডিবি অক্টোবরে তা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে। বর্তমানে কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসব নথি পর্যালোচনা করছে।
বড় প্রকল্প, বড় চ্যালেঞ্জ: গাবতলী-দাশেরকান্দি করিডর শুধু আরেকটি মেট্রোরেল রুট নয়; ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটারের বেশি অংশ পাতাল হওয়ায় শহরের ওপরের সড়কব্যবস্থায় তুলনামূলক কম প্রভাব রেখে বড় একটি নতুন গণপরিবহন করিডর তৈরি হবে।
তবে এ সুবিধার সঙ্গে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জও। পাতাল অংশের টানেল নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ, বিপুল অর্থের সংস্থান, বৈদেশিক ঋণ নিশ্চিত করা এবং সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করা— সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
তবু একনেকে অনুমোদন পেলে শুরু হবে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রথম
ধাপ। প্রথমে মাটি ও কাগজপত্রের কাজ, এরপর টানেল। আর সব পরিকল্পনা ঠিকভাবে এগোলে ২০৩৩
সালের আগস্টের মধ্যে গাবতলী থেকে রাসেল স্কয়ার পেরিয়ে দাশেরকান্দির সঙ্গে যুক্ত হবে
ঢাকার নতুন এই মেট্রোরেল করিডর।





