সংসদে ৩ বিল পাস, বিরোধী দলের ওয়াকআউট
- গুমের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা
- মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন
- স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ

ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া।
দেশে মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, গুমকে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানসহ সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে।
বিলগুলো হলো—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬ এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধনী) বিল ২০২৬।
তবে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি, দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ এবং স্পিকারের পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগের মধ্য দিয়ে বিলগুলো পাস হয়। প্রতিবাদে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্যরা।
আজ রবিবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে বিলগুলো পাস হয়।
২০০৯ সালের আইন রহিত করে পাস হওয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬-এর মাধ্যমে স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশনের নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বিলে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিশনে অন্তত একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া কমিশনকে অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা এবং জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদের আলোকে ‘জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে বিলটি পাসের আগে এর তীব্র সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, নতুন বিলে মানবাধিকার রক্ষায় দ্বৈত নীতি রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, সাধারণ কোনো নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে মানবাধিকার কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সদস্য জড়িত থাকলে কমিশনকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে নোটিশ দিয়ে জবাব চাইতে হবে। একই অপরাধে দুই ধরনের তদন্তব্যবস্থা থাকতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যরাও এ দেশের নাগরিক। একই অপরাধে একজনের বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত করা যাবে, আর অন্য ক্ষেত্রে কমিশন আটকে যাবে—এটা হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, সরকার আগে অধ্যাদেশ বাতিলের সময় শক্তিশালী ও আরও ভালো আইন আনার কথা বলেছিল। কিন্তু বর্তমানে যে আইন আনা হয়েছে, তাতে মানবাধিকার কমিশনকে সমান ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা ঘোষণা দেন, এমন দুর্বল আইনের পাসের অংশীদার তারা হবেন না। এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা বিলের আলোচনায় অংশ না নিয়ে ওয়াকআউট করেন।
এ সময় সভাপতির আসনে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধীদলীয় নেতার ওয়াকআউটের ঘোষণার পর তাকে ‘ধন্যবাদ’ জানান। পরে এ আচরণ নিয়ে স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন বিরোধী দলের নেতারা।
গুমের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও জরিমানা ১ কোটি টাকা
পাস হওয়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬-এ গুমকে আমলযোগ্য, অ-জামিনযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিলে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের মাধ্যমে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণের পর তার অবস্থান অস্বীকার বা গোপন করা হলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।
আইনের অধীনে গুমের সাধারণ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে গুম হওয়া ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।
বিলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা, ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা, ক্ষতিপূরণ তহবিল এবং নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি পরিবারের ব্যবহারের আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে। নিখোঁজের পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার জন্য সনদ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।
তবে এ আইনে কোনো স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা গঠনের বিধান রাখা হয়নি। তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুম প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে এই বিল আনা হয়েছে। বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সম্পত্তিতে আজীবন ভোগস্বত্ব
১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধনী) বিল ২০২৬-এ ‘আজীবন ভোগস্বত্ব সংরক্ষিত দান’ নামে নতুন একটি আইনি ধারণা যুক্ত করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে পিতা-মাতা, পিতামহ বা দাতারা নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় কিংবা জীবনসঙ্গীর নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও আমৃত্যু সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনি অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। এই বিধান সব ধর্মের নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
তবে বিলটি নিয়ে আপত্তি জানান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তারা দাবি করেন, এর কিছু বিধান কোরআন ও সুন্নাহর নীতির পরিপন্থি। বিষয়টি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোরও দাবি জানান তারা।
জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে গেলে বিরোধী দলের সদস্যরা সাময়িক ওয়াকআউট করেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই সংশোধনী সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের হেবার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং বিদ্যমান কোনো ধর্মীয় ব্যবস্থার সঙ্গে এর সংঘাত নেই।
বিরোধীদলের ওয়াকআউট
জাতীয় সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং সম্পত্তি হস্তান্তর বিল পাসের প্রতিবাদে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। এ দিনটিকে সংসদের জন্য ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন বিরোধী দলের নেতারা।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম স্পিকারের সমালোচনা করে বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে কথা বলতে চাইলেও স্পিকার তাকে যথাযথ সুযোগ না দিয়ে উল্টো মশকরা করেছেন। তিনি স্পিকারের এ ধরনের আচরণকে চরম হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের মতামতের কোনো তোয়াক্কা না করে সরকার তড়িঘড়ি করে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল উত্থাপন ও পাস করেছে। এসব বিলে স্বাধীন তদন্তের ন্যূনতম সুযোগও রাখা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় মুখপাত্র নজিবুর রহমান সম্পত্তি হস্তান্তর বিলকে কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেন। আইনমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, ইসলামী আইনের ধারণা যথাযথভাবে না রেখেই বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নজিবুর রহমান বলেন, স্পিকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু তিনি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ আইনকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আরও দুর্বল করে সংসদে পাস করেছে।







