রমরমা ২৪ হিমায়িত কারখানায় তালা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কারখানার জেনারেটর টানা চলছে, আর প্রতি লিটার ডিজেলের সঙ্গে লাফিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি লোডশেডিংয়ের কারণে সংকটে পড়েছে প্রক্রিয়াজাত হিমায়িত খাদ্য (ফ্রোজেন ফুডস) শিল্প। পচনশীল পণ্যের এ খাতটিতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন কোল্ড-চেইন ও মাইনাস ১৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক হওয়ায় সার্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ বিপর্যয়। এর চরম মাশুল গুনতে গিয়ে একের পর এক প্রসেসিং কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, উৎপাদন কমছে এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি খাতের এ ভয়াবহ সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি মো. শাহজাহান চৌধুরী বললেন, ‘আমাদের ফ্যাক্টরিগুলোয় ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়েছে, আবার চাহিদামতো তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যমান সংকটের কারণে এরই মধ্যে ২৪টি ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং চলতি বছর আরও তিন থেকে চারটি বন্ধ হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট বজায় থাকলে দেশের হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে।’
উৎপাদন খাতের এ সংকট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলে ধরে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ কামরুল আলম বললেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানা প্রায় ৭ ঘণ্টা চলছে জেনারেটরে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটরের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে, এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে পারে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কারখানাগুলোয় উৎপাদন কমার পাশাপাশি রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত চিংড়িচাষি, মৎস্যজীবী ও কারখানার শ্রমিকসহ লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নিয়ে ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। তাই হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি খাতকে সচল রাখতে শিল্পাঞ্চলগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ থেকে বার্ষিক গড়ে প্রায় ৪০-৪২ কোটি ডলারের হিমায়িত সামুদ্রিক খাবার প্রধানত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে রপ্তানি হয়। তবে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের চড়া মূল্যে ফ্রিজিং ব্যাকআপ দিতে গিয়ে জাহাজের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে দরদামে অসম্ভব হয়ে পড়েছে টিকে থাকা।
ফাহিম সি ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হাসান পান্নার ভাষ্য, ‘অব্যাহত লোডশেডিংয়ের কারণে বাধ্য হয়ে আমাদের জেনারেটরের জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেল কিনতে হচ্ছে, ফলে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। তা ছাড়া বিদ্যুৎ যাওয়ার পর জেনারেটর চালু হতে যে সময় লাগে, সে সামান্য সময়েও প্রসেসিং ইউনিটের তাপমাত্রা ওঠানামা করে এবং পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।’
এদিকে দেশের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ ফ্রোজেন ফুডবাজারও চরম সংকটে পড়েছে। প্রাণ-আরএফএল (ঝটপট), কাজী ফার্মস কিচেন, এজি ফুড, বেঙ্গল মিট কিংবা ব্র্যাকের মতো শীর্ষস্থানীয় দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো কোল্ড-চেইন রক্ষা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (মার্কেটিং) কামরুজ্জামান কামাল বললেন, ‘কারখানায় উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গিয়ে বর্তমানে জ্বালানি সংকট সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধিতে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। দ্রুত সমাধান না হলে প্রক্রিয়াজাত নিত্যপণ্য ও হিমায়িত খাদ্যের সরবরাহ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’
উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থার পাশাপাশি প্রভাব ফেলছে খুচরা পর্যায়েও। শহরের মুদিদোকান, ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট ও সুপারশপগুলোয় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ডিপ ফ্রিজগুলো বন্ধ থাকছে, যা খুচরা বিক্রেতাদের হিমায়িত খাদ্য মজুদ করতে নিরুৎসাহিত করছে। প্রসেসিং প্ল্যান্ট ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের এমন স্থবিরতার ধাক্কা গিয়ে পড়ছে একদম প্রান্তিক পর্যায়ে।
সামুদ্রিক মাছের আইস মিলগুলোয় বরফ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রসেসিং কারখানাগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিংড়িচাষিরা উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। তৈরি পোশাক খাতের পর অন্যতম সম্ভাবনাময় এ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে রক্ষা করতে এখনই জ্বালানি সহায়তা ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





