প্রকল্প শেষেই দিতে হবে ভালো-নষ্ট গাড়ির হিসাব

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গাড়ি কেনাটা যেন এক প্রকার নিয়তি। প্রকল্প পরিচালক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতনদের খুশি করতে হলেও এ উপাদান লাগবেই। তবে কিছুদিন ধরে সরকারি সিদ্ধান্তে গাড়ি কেনায় লাগাম পড়েছে। এবার উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ির তালিকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে এর সঙ্গে কম্পিউটারসহ অন্যান্য দামি সামগ্রীরও হিসাব দিতে হবে। গত ২২ জুলাই অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবে নেওয়া হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ৬ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে পরিকল্পনা বিভাগ। তবে খোদ পরিকল্পনা কমিশন চত্বর যেন পরিণত হয়েছে নষ্ট গাড়ির ভাগাড়ে। কেননা পরিকল্পনা কমিশন চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে ১০-১২টি নষ্ট গাড়ি। এগুলো একটু মেরামত করলেই ব্যবহার উপযোগী হতো। কিন্তু সেটি না করায় অর্থের অপচয় ঘটছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত পরিকল্পনা কমিশন চত্বর ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র।
পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার আগামীর সময়কে বলেছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর অনেক গাড়িসহ মূল্যবান জিনিসপত্রের কোনো হদিস থাকে না। ফলে সরকারি টাকার অপচয় হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে একনেক বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত যাতে বাস্তবায়িত হয়, সেজন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশন চত্বরের নষ্ট গাড়ি প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘এগুলো অনেক আগের বিভিন্ন প্রকল্পের নষ্ট গাড়ি। আমরা বিআরটিএকে বলেছি এসব গাড়ি নিয়ে যেতে। তারা বলেছে নিয়ে যাবে। তবে জানি না কবে নাগাদ নিয়ে যাবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই একনেক বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান’ নামের একটি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। এ প্রকল্পে ১০০টি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব ছিল। এ বিষয়ে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এ প্রকল্পের দুটি পর্যায় এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। ওই দুটি পর্যায়ের মোটরসাইকেল ও কম্পিউটার কেনা সত্ত্বেও পুনরায় এসব সামগ্রী কেনার প্রয়োজনীয়তা কী? এর উত্তরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব জানালেন, প্রকল্পটি দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় বাস্তবায়ন হবে বিধায় ১০০টি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে, কেননা আগের কেনা মোটরসাইকেলের অধিকাংশই ব্যবহার অনুপযোগী।
এ প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ওই সভায় বলেছিলেন, প্রতিটি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর আওতায় কেনা যানবাহন, কম্পিউটার ও অন্যান্য সম্পদের একটি পূর্ণাঙ্গ ইনভেনটরি তৈরি করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ইনভেনটরি বা স্টকের তালিকা তৈরি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে। এসব সম্পদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ থাকা প্রয়োজন। প্রকল্পের আওতায় কেনা গাড়ির তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিবহনপুল নিয়মিত হালনাগাদ করবে। এক্ষেত্রে যেসব যানবাহন ব্যবহার উপযোগী নয়; তা বছর শেষে নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে গাড়িসহ মূল্যায়ন যন্ত্রপাতির বিষয়ে।
সূত্র জানায়, বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সরকারি প্রকল্প শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ব্যবহৃত গাড়ি পরিবহন পুলে জমা দিতে হবে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। ফলে এগুলো অন্য কোনো সরকারি দপ্তরে বা প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না। আবার সংরক্ষণের অভাবে গাড়ি নষ্ট হয়ে সরকারের আর্থিক অপচয় ও ক্ষতি হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, শহীদ মিনার চত্বর, প্রটোকল শাখার পাশে, আইএমইডি চত্বর এবং কমিশনের সেকেন্ড গেটের পাশের গ্যারেজে দুটিসহ ১১টি বিভিন্ন মডেলের গাড়ি নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। কোনোটির চারপাশে লতাগুল্ম জন্ম নিয়েছে, কোনোটি ধুলায় ঢাকা, আবার কোনোটি ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, কিছু টাকা খরচ করে মেরামত করলে এসব গাড়ির অধিকাংশই চালানো যেত। এর মাধ্যমে কর্মকর্তাদের গাড়ির চাহিদা বা যোগাযোগ সংকট কিছুটা মোকাবিলা করা সম্ভব হতো।





