বদলে যাচ্ছে সাক্ষরতার সংজ্ঞা

সংগৃহীত ছবি
কোনো ভাষা পড়তে, লিখতে ও বুঝতে পারার দক্ষতাই হলো সাক্ষরতা— ইউনেসকোর সংজ্ঞায় এমনই বলা আছে। কিন্তু বাংলাদেশে নিজের নাম লিখতে পারা কিংবা স্বাক্ষর দিতে পারলেই সাক্ষরতার খাতায় নাম লেখা হতো। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সে ধারা বদলের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
নতুন ধারা অনুযায়ী শুধু নাম লেখা, পড়তে পারা কিংবা স্বাক্ষর করতে পারাই যথেষ্ট নয়; বরং জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্য পড়া ও বোঝা; লিখতে পারা, মৌলিক হিসাবনিকাশ করা এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে জীবিকা অর্জনের সক্ষমতাকে সাক্ষরতার অংশ করতে চায় সরকার। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, তরুণদের শুধু মৌলিক শিক্ষা নয়, কারিগরি ও প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রাপ্তবয়স্ক নিরক্ষরদের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ফাংশনাল লিটারেসি বা কার্যকর সাক্ষরতাকে।
‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’— এ প্রতিপাদ্য দিয়ে আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হবে। দিবসটি উপলক্ষে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো আয়োজিত আলোচনা সভায় অংশ নেবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন।
বদলে যাচ্ছে সাক্ষরতার সংজ্ঞা
গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাক্ষরতার ধারণা এখন অনেক বিস্তৃত। একজন মানুষ দৈনন্দিন জীবনে দরকারি লেখা পড়তে ও বুঝতে পারছেন কি না, হিসাব করতে পারছেন কি না, তথ্য ব্যবহার করতে পারছেন কি না এবং সেই জ্ঞান দিয়ে নিজের জীবন ও জীবিকা উন্নত করতে পারছেন কি না— সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নতুন কর্মসূচিগুলোতে প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই পরিবর্তনের। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিকল্পনায় সাক্ষরতার সঙ্গে প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, অকুপেশনাল ট্রেড এবং জীবিকায়ন দক্ষতা যুক্ত করা হয়েছে। এখন লক্ষ্য শুধু নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষর করা নয়; বরং স্বাক্ষর মানুষকে দক্ষ ও কর্মক্ষম করে তোলা।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মনোয়ারা ইশরাত আগামীর সময়কে বলেছেন, এখনকার সময়ে শুধু সাক্ষরতার সংখ্যা দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। কার্যকর সাক্ষরতার দিকে যেতে চাই। সেজন্য নিরক্ষর ব্যক্তিকে এমন সাক্ষরতা দিতে চাই, যা তার দৈনন্দিন জীবন, সমাজ এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে এবং নিজের অধিকার রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
সাক্ষরতায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়: আন্তর্জাতিকভাবে ১৫ বছর বয়স ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার দিয়ে দেশগুলোর তুলনা করা হয়। এ হিসাবে এশিয়ার উন্নত ও অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশগুলোর বেশিরভাগই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। মালদ্বীপে সাক্ষরতার হার ৯৮, শ্রীলংকায় ৯২, ভারতে ৮০ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে নেপালে ৭০ শতাংশের কিছু বেশি। বিপরীতে পাকিস্তানে ৬০ আর আফগানিস্তানে ৪০ শতাংশের নিচে।
এশিয়ার বৃহত্তর চিত্রে ব্যবধান আরও স্পষ্ট। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ৯০ শতাংশের ওপরে। অর্থাৎ এশিয়ায় বাংলাদেশকে এখনো উচ্চ সাক্ষরতার দেশগুলোর কাতারে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি; উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই, ঝরে পড়া কমানোর বিভিন্ন কর্মসূচি এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের কারণে সাক্ষরতার পরিধি বেড়েছে— এমনটিই বলছেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিচালক দেবব্রত চক্রবর্তী। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, আমাদের লক্ষ্য, অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে নিরক্ষর ব্যক্তিদের কীভাবে মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা যায়।
নিরক্ষর পৌনে চার কোটি মানুষ: সর্বশেষ বিবিএসের পরিসংখ্যান-২০২৫ অনুযায়ী, দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। এর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৩১ হাজার মানুষ এখনো নিরক্ষর। স্বাধীনতার ৫৬ বছর পর দেশে নিরক্ষরের এ সংখ্যাকে রাজনৈতিক সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা ছিল, ২০১৪ সালের মধ্যে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করার। ২০১৪ তো দূরের কথা, ২০২৬ এসে চিত্র একইরকম। সরকারগুলোর এ জায়গায় কাজ করার আগ্রহ কম। এমন পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
৬৪ জেলায় প্রশিক্ষণ, জব লিংকেজ ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ: সাক্ষরতার পুরনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছে সরকার। নতুন সংজ্ঞায় সাক্ষরতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দক্ষতা, কর্মসংস্থান, জীবিকায়ন ও দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর সক্ষমতা। এরই অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬৪ জেলার সদরে ঝরে পড়া ৫ হাজার ১২০ তরুণ-তরুণীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়। নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জনের মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন প্রশিক্ষণ শেষ করেন এবং ৩ হাজার ৮৮২ জন কর্মে যুক্ত হন। প্রশিক্ষণ শেষে ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ উপকারভোগী কর্মসংস্থান, শিক্ষানবিশ, উদ্যোক্তা বা জব লিংকেজের সুযোগ পেয়েছেন।
পানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিচালক বলেছেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঝরে পড়া তরুণ-তরুণীদের কর্মমুখী করে তোলা এবং প্রাপ্তবয়স্ক নিরক্ষরদের প্রয়োজনীয় পড়া, লেখা ও মৌলিক গণিতে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের লিটারেসি অ্যাম্বাসাডর হিসেবে যুক্ত করে এ কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।





