কথা বলুন, পাশে দাঁড়ান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে আত্মহত্যা বাড়ছে। কেন বাড়ছে, এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার এখন সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে দেশে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ১৯০ জন স্কুলপড়ুয়া শিশু, অর্থাৎ মোট আত্মহত্যার ৪৭.৪০ শতাংশ ঘটছে স্কুলপড়ৃুয়া শিশুদের ক্ষেত্রে।
স্কুলগামী শিশুরা মানসিক দিক থেকে খুব সংবেদনশীল। তাদের আবেগ বেশি, তারা অভিমানী হয় এবং নানা কারণে হয় নিঃসঙ্গ। এদের মধ্যে খুব সামান্য কারণেই হতাশা কাজ করে। আত্মহত্যার পেছনে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, স্কুলে শাস্তি, পড়া না পারা, পরীক্ষায় খারাপ করা, প্রেম, যৌন নির্যাতন, অভাব-অনটন এবং জিনগত কারণও কাজ করে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঝুঁকি বাড়ায়। এর মানে আমাদের স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা মানসিক সমস্যায় ভুগছে এবং একাই এ অবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তাদের কষ্ট বা সমস্যার কথা শোনার বা শেয়ার করার মতো কেউ নেই।
স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কোনো মানুষ কখনোই তার জীবনকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই জীবনটা তার কাছে মূল্যবান থাকে।’ তাহলে কি আমাদের শিশু-কিশোরদের সামনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যে তারা জীবনকে মূল্যহীন ভাবছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সের কিশোর ও কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিক্ষণে মনে ও শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন সম্পর্কে তারা কারও সঙ্গে কথা বলতেও সংকোচ বা বিব্রত বোধ করে। এ থেকে তাদের মধ্যে জন্ম নেয় অস্থিরতা, বিষণ্নতা এবং উদ্বেগ। সমস্যা যখন আরও গভীর হয়, তখন তারা নিজেকে আনন্দ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে গুটিয়ে ফেলে। এ সময়ে তৈরি হওয়া দূরত্ব পরে নানা রকম সমস্যা তৈরি করে।
আমাদের স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা মানসিক সমস্যায় ভুগছে এবং একাই এ অবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তাদের কষ্ট বা সমস্যার কথা শোনার বা শেয়ার করার মতো কেউ নেই
আমেরিকান উপন্যাসিক উইলিয়াম স্টাইরন তার ‘ডার্কনেস ভিজিবল: আ মেমোয়ার অব ম্যাডনেস’ বইতে বলেছেন, মানুষ যখন বিষণ্ন হয়, তখন তার চারদিকে কোনো আলো থাকে না; বরং ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে। অনেকটা কালো চশমা দিয়ে বাইরের পৃথিবীকে দেখার মতো। যার ফলে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু অন্ধকার ও বিবর্ণ মনে হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর জানাচ্ছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৪১ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন। বছরে এই সংখ্যা প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজারের বেশি। যত মানুষ আত্মহত্যা করেন, তার চেয়ে ২০ গুণ বেশি মানুষ ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ করেন। শুধু আত্মহত্যার হার নয়; মানসিক রোগের প্রকোপও বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে অনেক বেশি।
লোকলজ্জা ও পাগল বলে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে আমাদের দেশে মানসিক সমস্যার প্রকৃত হার ও বিস্তার বোঝাও কঠিন। আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার সব ঘটনা প্রকাশ পায় না, নথিভুক্তও হয় না।
এমনকি ডাক্তারদের মধ্যেও মানসিক অবসাদের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে মানসিক রোগ চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসা গ্রহণ তেমন একটি হয় না। ফলে আত্মহত্যার হার দিন দিন বাড়ছে।
ওই সেমিনারে আত্মহত্যার চেষ্টাকে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার বিধান বাতিল বা সংস্কারেরও সুপারিশ করা হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে অপরাধ বিবেচনা করা ঠিক নয়। আত্মহত্যার চেষ্টা করে যারা ব্যর্থ হন, তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি না নিয়ে চিকিৎসা করা উচিত।
কেউ আত্মহত্যা করলে সবাই জানতে চান, কেন মানুষটি আত্মহত্যা করল? এর উত্তর ডেভিড হিউম ১৭ শতকে তার আত্মহত্যাবিষয়ক প্রবন্ধে দিয়েছেন এইভাবে, “অনেক ধরনের উপাদান বা পরিস্থিতি একজন ব্যক্তির বোঝার ক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশকে নাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু কেন সে নিজেই নিজের জীবন কেড়ে নেয়, তা আমরা কোনোদিনও জানতে পারব না। আমরা জানতে পারব না, মানুষটির ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনা ও যুক্তি ‘সুইসাইড’ করার আগের মুহূর্তে কেমন থাকে।”
অনেক মানসিক অবসাদগ্রস্ত রোগী ডাক্তারকে বলেছেন, তারা যখন আত্মহত্যা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন, তখন তারা তাদের প্রিয়জনের কথা ভাবেননি। কারণ, তখন তাদের কাছে নিজেদের ব্যথাটাই খুব বেশি ছিল। মনে হতে পারে, এটি খুব স্বার্থপরের মতো আচরণ। মানুষ আদতে আত্মহত্যা করে শুধু নিজে পালিয়ে বাঁচার জন্য, অন্য কারও জন্য মারা যাওয়াটা সুইসাইড নয়। সে আসলে নিজে বাঁচার উপায় হিসেবেই মৃত্যুকে বেছে নেয়।
অধিকাংশ মানুষ খুব একটা পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা করে না। বিষণ্নতা থেকে আবেগ তৈরি হয়, আশা চলে যায়। মানুষ যখন অন্য কোনো উপায় খুঁজে পায় না, কাউকে পাশে পায় না, তখন একমাত্র উপায় হয় আত্মহত্যা।
আশার কথা হচ্ছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য। মানসিক রোগ সম্বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আগে থেকেই এগুলো চিহ্নিত করে চিকিৎসা দিলে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
আমাদের সবার দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের ওই মুহূর্তটাকে ঠেকানো, তার পাশে দাঁড়ানো। সুস্থভাবে বাঁচার জন্যই দরকার পরিবার, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, দেওয়া-নেওয়ার মতো সম্পর্ক।
আমার বাবা সবসময় বলতেন, সবার সঙ্গে থাকলে দুঃখ বাড়ে না, বরং কমে। মানুষ তখন অনুভব করে যে সে একা নয়। আধুনিক মানুষ এখন বেশি একা হয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা ও বৈষম্য একাকিত্ব, হতাশা ও বিষণ্নতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই মানুষ বুঝতে পারে না যে তার পাশের মানুষটি, ঘরের শিশুটি যেকোনো সময় আত্মহত্যা করতে পারে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক





