পকেট কাটছে চিকিৎসা ব্যয়, বীমায় সমাধানের সন্ধান
- চিকিৎসা খরচের ৭৯ শতাংশই যাচ্ছে মানুষের পকেট থেকে
- অসংক্রামক রোগে গড় আয়ু বৃদ্ধির অর্জন বড় ঝুঁকিতে
- মাথাপিছু জিডিপি ২৬০০ ডলার হলেও স্বাস্থ্যে ব্যয় ৫৩ ডলার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। নিজের পকেট থেকে যাচ্ছে ৭৯ শতাংশ টাকা। বিশ্বের সব দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ এই ব্যয়। সামান্য অসুস্থতাও মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে দারিদ্র্যের দিকে, দরিদ্র থেকে হচ্ছে আরও দরিদ্র। যারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে, তারাও যেন চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে টোকা দিলে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায়। অসংক্রামক রোগ বাড়ায় গড় আয়ুর অর্জনও এখন ঝুঁকিতে।
মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ৬০০ ডলার হলেও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় মাত্র ৫৩ ডলার। আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ক্যানসার। খাদ্যে ভেজাল ও ট্রান্স-ফ্যাটের কারণে আরও বাড়ছে ঝুঁকি। পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে কমছে এর কার্যকারিতা, যা নতুন করে চিকিৎসাক্ষেত্রে তৈরি করছে বড় হুমকি। সেই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে পঙ্গুত্ব ও পারিবারিক বোঝা।
পরিস্থিতির উত্তরণে আপাতত স্বাস্থ্য বীমায় সমাধান খুঁজছে সরকার। পাশাপাশি থাকছে আরও বেশকিছু উদ্যোগ। পাঁচ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা বা ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক’-এ এসব বিষয় তুলে ধরেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। লক্ষ্য— চিকিৎসায় পকেটের খরচ ৫০ শতাংশের নিচে নামানো। এজন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে আসছে জাতীয় সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জোর দিতে শক্তিশালী করা হবে ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক। ২০৩১ সালের মধ্যে নিয়োগ পাবেন দুই লাখেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাস্থ্য বীমা চালু করা সহজ নয়। দেশে বীমা খাতের অবস্থা এমনিতেই নাজুক। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে দরকার সুচিন্তিত পরিকল্পনা।
জিইডি বলছে, সমস্যার সমাধানে সর্বজনীন সমন্বিত স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিকল্প নেই। সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছে সরকার। কেননা, মহামারীগত রূপান্তর, সংক্রামক রোগের বোঝা কমানো, দ্রুত ক্রমবর্ধমান অসংক্রামক রোগ, হামের পুনরুত্থান এবং মোট প্রজনন হারের বিপরীতমুখী প্রবণতা স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা প্রকাশ করছে। বর্তমানে দেশে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৭৩ বছর, যা আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে বেশি; কিন্তু অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধিতে হুমকির মুখে পড়েছে এই অর্জন।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘স্বাস্থ্য বীমা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই প্রয়োজন আছে, এটা বলাই বাহুল্য। যেহেতু স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অর্থায়ন বড় বিষয়, সেহেতু বীমার ব্যবস্থা হলে ভালো হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— কারা করবে, কীভাবে করবে। এখানে সরকার, বেসরকারি খাত, ব্যক্তি এককভাবে করবে, নাকি যৌথভাবে হবে। এ ছাড়া আমাদের বীমা ইন্ডাস্ট্রি এমনিতেই হতাশার মধ্যে আছে। বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোরই স্বাস্থ্য ভালো নেই। এমন অবস্থায় স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হলে সুচিন্তিত পরিকল্পনা দরকার। বিশেষ করে বিশ্বে আমাদের মতো দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।’
ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, যদি প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখন প্রতিটি অস্ত্রোপচার, প্রতিটি সাধারণ জটিলতা, প্রতিটি যক্ষ্মার চিকিৎসা এবং শিশুদের নিউমোনিয়ার প্রতিটি কেস পরিচালনা করা আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। এ ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্বাস্থ্য খাত ঐতিহাসিকভাবে এটিকে উপেক্ষা করে এসেছে। অথচ এক্ষেত্রে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশ ভেজালযুক্ত থাকে, তখন শিশুদের খর্বকায়তা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। বেশিরভাগ রান্নার তেলে ট্রান্স-ফ্যাটের পরিমাণ নির্ধারিত সীমার চেয়ে চার গুণ বেশি থাকায় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না অসংক্রামক রোগের মহামারী। অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ খামার থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ায় কঠিন হয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ।
জিইডি বলেছে, উচ্চরক্তচাপের প্রকোপ ২১ শতাংশ, ডায়াবেটিস ১০ শতাংশ। উভয়ই দ্রুত বাড়ছে। এ ছাড়া ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে, এর মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের আওতা এখনো অনেক কম। প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৫ শতাংশ তামাক ব্যবহার করায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে পরিষেবা গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনাজনিত আঘাত একটি ক্রমবর্ধমান বোঝা। কিন্তু এটি একটি উপেক্ষিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
আরও বলা হয়েছে, জিডিপির ২ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ানো হবে। এর মাধ্যমে মানুষের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় ৫০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হবে। কেননা, বর্তমানে সরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু প্রকৃত খরচ জিডিপির শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন। এজন্য একটি জাতীয় সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া কৌশলগত ক্রয়ব্যবস্থা চালু এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বা চাহিদাভিত্তিক অর্থায়ন কৌশল সম্প্রসারণ করা হবে সব জেলায়।
ভবিষ্যতের চিকিৎসায় যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তিও। দ্রুত রোগ শনাক্তে চালু হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক ‘ওয়ান হেলথ’ মনিটরিং ব্যবস্থা। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোয় জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নজরদারি জোরদার করা হবে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন, ডিজিটালাইজেশন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ থাকবে। এসব পদক্ষেপ সময়মতো বাস্তবায়ন হলে কমবে মানুষের আর্থিক কষ্ট, নিশ্চিত হবে সবার স্বাস্থ্য অধিকার।
ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, দেশের ৭০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইএমআর (ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড) চালু, জাতীয় স্বাস্থ্য গোয়েন্দা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং টুলের পরিপক্বতা অর্জনের জন্য ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিস শক্তিশালী করা, স্থানীয়ভাবে ওষুধ ও টিকা উৎপাদনকে উৎসাহিত এবং গ্রামীণ এলাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিষেবা সহজলভ্য করতে প্রসার ঘটানো হবে টেলিমেডিসিনের।
ফ্রেমওয়ার্কটি তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ মানুষের আর্থিক কষ্ট কমিয়ে নির্ভরযোগ্য ও উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা হবে। এজন্য স্বাস্থ্য বীমা সমাধানের একটি অন্যতম পথ হতে পারে। স্বাস্থ্য খাতের নতুন কৌশলগত পরিকল্পনাটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প চক্রের পরিবর্তে একক কর্মসূচির মধ্যে নিয়ে আসা হবে। যেমন সম্মিলিত অর্থায়ন, উন্নয়নসহযোগী সমন্বয় এবং একীভূত পরিকল্পনায় স্থায়ী ও চলমান কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।’
যদিও বিপুল ব্যয় ও বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়ের কারণে স্বাস্থ্য বীমাকে জটিল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন অনেকেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘স্বাস্থ্য বীমা একটি জটিল প্রক্রিয়া। এটি বাস্তবায়নে অনেক বেশি সময় ও খরচ লাগবে। এর চেয়ে ব্রিটেনের মতো ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস চালু করা যায় কি না, সরকারকে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বীমার বিষয়টি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। জনগণের কাছ থেকে করের টাকা তুলে এটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করতে হবে।’
আসছে আরও যেসব উদ্যোগ: চলতি অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা হবে। মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে প্রায় ১১৫ জন থেকে কমিয়ে পূরণ করা হবে ৩০ জনে আনার লক্ষ্য। নবজাতকের মৃত্যুহার, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বতা কমানো হবে। ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর জন্য জলবায়ুগত স্বাস্থ্যঝুঁকি মানচিত্রায়ণ এবং অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। রয়েছে স্থানীয় ওষুধ ও টিকা উৎপাদনে প্রণোদনা এবং এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) পুনর্গঠন। চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের ওপর গবেষণা জোরদার করা হবে। এ ছাড়া ২০৩১ সালের মধ্যে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যশিক্ষা কর্মীসহ সম্মিলিত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব প্রতি ১ হাজার জনে ৩৬ জন বৃদ্ধি এবং চিকিৎসকের তুলনায় নার্স ও ধাত্রীর অনুপাত শূন্য দশমিক ৯৪ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ২-এ উন্নীত করা হবে। এর জন্য দুই লাখের বেশি জনবল নিয়োগ করা হবে।





