সানার দখল নিতে হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযানে ইয়েমেনি বাহিনী, নিহত ৭

হুতি স্থাপনায় ইয়েমেনি বাহিনীর হামলায় আগুন ধরে যায়। ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক পাল্টা হামলা শুরু করেছে। এক দশকের বেশি সময় আগে রাজধানী সানা দখল করে নেয় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। এবার রাজধানীটি পুনর্দখলের লক্ষ্য নিয়েছে সরকারি বাহিনী। এরই মধ্যে একটি কারাগারে ইয়েমেনি বাহিনীর হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন।
ইয়েমেনের উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী মেজর জেনারেল সামির আল-সাবরি স্থানীয় সময় সোমবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ‘সানা পুনর্দখলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এ ঘোষণার পরেই আল-বায়দা ও আল-জাওফ প্রদেশে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। এই দুই অঞ্চলকে সানায় যাওয়ার প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে দেখা হয়। হুতিরা জানিয়েছে, আল-জাওফের আল-হাজম এলাকায় একটি কারাগারে হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন।
সরকারপন্থী বাহিনীর মুখপাত্র মাজিদ আল-নুজাইলি সোমবার বলেছেন, এ অভিযানের লক্ষ্য হুতিদের ‘কবজা থেকে ইয়েমেনকে মুক্ত করা’ এবং ‘সানাকে সব ইয়েমেনির রাজধানী হিসেবে ফিরিয়ে আনা’।
তিনি বেসামরিক মানুষের সানামুখী কয়েকটি প্রধান সড়ক এড়িয়ে চলার সতর্কতা দিয়েছেন। এর মধ্যে সানার সঙ্গে মারিব ও আল-জাওফের সংযোগকারী সড়ক রয়েছে। নিহম, সিরওয়াহ, মাহলিয়াহ ও আল-হাজম হয়ে যাওয়া সড়কগুলোও এর আওতায় রয়েছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর ইয়েমেনে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই থেমে গিয়েছিল। নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে হুতিরা সানা দখল করার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে।
কূটনীতিকরা আশা করেছিলেন, ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি করবে। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধকে ঘিরে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
জুলাইয়ে ইয়েমেনে আবার লড়াই শুরু হয়। সেসময় সরকারি বাহিনী হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায়। এতে ইরান থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ সেখানে অবতরণ করতে পারেনি।
এরপর গত সপ্তাহে হুতিরা বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। তারা পশ্চিম তায়েজ ও দক্ষিণ হোদেইদাহ হয়ে আল-মাখা বন্দরনগরী এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।
এর আগে হুতিরা ওই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজে অবরোধ ঘোষণা করেছিল।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য বাব আল-মান্দাব গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত করার পর সৌদি তেল রপ্তানির জন্য এই পথটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
আল জাজিরার ইয়েমেনবিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি বলেছেন, হুতিদের প্রথম দফার বড় হামলা সামলে উঠেছে সরকারি বাহিনী। এরপর তারা একাধিক এলাকায় লড়াই ছড়িয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে হুতিদের বাহিনীকে বিভিন্ন দিকে ব্যস্ত রাখা এবং তাদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার মূলত তায়েজের পশ্চিম ও হোদেইদাহর দক্ষিণে লড়াই চলছিল। এখন তা আল-দালেয়া, মারিব, আল-জাওফ ও আল-বায়দা প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
আল-শালাফি বলেছেন, ‘আল-জাওফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি সৌদি আরবের সীমান্তে এবং হুতিদের প্রধান ঘাঁটি সাদার দিকে যাওয়ার পথ। আল-বায়দার অবস্থানও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইয়েমেনের মাঝামাঝি এলাকায়। প্রদেশটি উত্তরের চারটি ও দক্ষিণের চারটি— মোট আটটি প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সোমবার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে প্রায় ৯০০ মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই তায়েজ ও দেশটির পশ্চিম উপকূলের এলাকার। সংস্থাটি জানিয়েছে, শুধু তায়েজ থেকেই প্রায় ২১ হাজার মানুষ বা প্রায় ৩ হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি সোমবার হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্যের দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, আল-জাওফ, আল-বায়দা, তায়েজ ও হোদেইদাহতে সরকারি বাহিনী অগ্রসর হয়েছে।
এক বিবৃতিতে আল-আলিমি বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় প্রতিষ্ঠিত না হওয়া এবং পুরো ইয়েমেনের ওপর তাদের কর্তৃত্ব ফিরে না আসা পর্যন্ত আমাদের সশস্ত্র বাহিনী তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে যাবে।’
তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে শান্তির বদলে সংঘাত বাড়ানোর পথ বেছে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। এ ধরনের পদক্ষেপের সব পরিণতির দায় হুতিদেরই নিতে হবে বলেও সতর্ক করেছেন।
সরকারপন্থী বাহিনীর গণমাধ্যমকেন্দ্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার তায়েজের পশ্চিমে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে কয়েক দফা বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে আল-জাওফের ইয়াতমায়ও হামলা চালানোর দাবি করেছিল তারা। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছিল, প্রদেশটিতে হুতিদের সঙ্গে ‘তীব্র লড়াই’ চলছে।
গণমাধ্যমকেন্দ্রটি আরও জানিয়েছে, সরকারি বাহিনী আল-বায়দার ধি নাইম জেলার উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে।
অন্যদিকে হুতিরা বলেছে, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বড় ধরনের অগ্রযাত্রা তারা ঠেকিয়ে দিয়েছে। আল-জাওফের আল-লাবানাত পাহাড়ের দিকে ওই বাহিনী অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে দাবি করেছে তারা।
হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, সরকারি বাহিনীর কয়েক ডজন যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছেন। আল-জাওফে হুতিদের বাহিনী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সরকারি বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধির জন্য আসা দলগুলোর ওপরও হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
তার দাবি, এসব হামলায় কয়েক ডজন গাড়ি ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহত ও আহতদের মধ্যে কয়েকজন কমান্ডারও রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন।
তবে হুতিদের ও ইয়েমেন সরকারের এসব দাবি আলাদাভাবে যাচাই করতে পারেনি আল জাজিরা।
সূত্র: আল জাজিরা






