সাগরে জেলেদের ‘ডিজিটাল লাইফলাইন’ স্টারলিংকে
- সাড়ে ৫ হাজার মাছ ধরার ট্রলারে এক লাখ কর্মসংস্থান
- ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২৯ ট্রলারডুবি
- ২২৭ জনের মৃত্যু ১১৩ জন নিখোঁজ

প্রতীকী ছবি
‘মাঝি তোর রেডিও নাই বইলা জানতেও পারলি না, আইতাছে ভাইঙ্গা এত বড় ঢেউ। সারা বাংলাদেশ জানলো মাঝি, তুই তো জানলি না রে’— ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের প্রেক্ষাপটে ফিডব্যাক ব্যান্ডের মাকসুদুলু হকের গাওয়া ‘মাঝি-৯১’ গানের এ পঙ্ক্তি যেন সাড়ে তিন দশক পরও কক্সবাজারের জেলেজীবনের সংগ্রামের সঙ্গে মিলে যায়।
সময় বদলেছে। সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলার বদলেছে, বেড়েছে ইঞ্জিনের সক্ষমতা। বিনিয়োগের অঙ্কও। এখন সমুদ্রগামী প্রতিটি ট্রলার বানাতে খরচ হচ্ছে ৬০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা। কিন্তু সাগরের মাঝখানে বিপদে পড়লে তীরে খবর পৌঁছানোর ব্যবস্থা এখনো অনেকটাই সেকেলে। উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে গেলেই দুর্বল হয়ে পড়ে স্থলভিত্তিক মোবাইল নেটওয়ার্ক। অথচ কক্সবাজারের মাছ ধরার ট্রলারগুলো মাছের সন্ধানে ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূর সমুদ্রে চলে যায়। গভীর সমুদ্রে একটি ট্রলার বিপদে পড়লে তীরে খবর পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ে। আশপাশে অন্য ট্রলার থাকলে, তারাই ত্রাণকর্তা হিসেবে উদ্ধারে এগিয়ে আসে।
গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে ‘এফবি তাহসিন’ ট্রলারডুবির ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে এ পুরনো সংকট। ঝড়ো বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে আট জেলেসহ ট্রলারটি উল্টে যায়। চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও ফয়েজ আহমেদ ও সাইফুল করিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ নুরুল আলম ও মুহিবুল্লাহর মরদেহ সোনাদিয়া চ্যানেলের হাঁড়িরমুখ চর এলাকায় পাওয়া যায়।
কুতুবজোম এলাকার ফরিদুল আলমের ট্রলারটি নিয়ে আট জেলে সাগরে গিয়েছিলেন। সোনাদিয়ার দক্ষিণ-পূর্বদিকে হাঁড়িরমুখ এলাকায় ঝড়ো বাতাস ও বিশাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। আশপাশের ফিশিং বোট চারজনকে উদ্ধার করতে পারলেও বাকি চারজন নিখোঁজ হন। ট্রলারের মালিক ও মাঝি ফরিদুল আলম বলেছেন, পরপর তিনটি ঢেউ সামলানো গেলেও চতুর্থ ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি উল্টে যায়। কক্সবাজার দেশের অন্যতম বড় সামুদ্রিক মৎস্যকেন্দ্র। টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর, পেকুয়া ও চকরিয়ার উপকূল থেকে প্রতিদিন অসংখ্য নৌযান সাগরে যায়।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে নিবন্ধিত যান্ত্রিক মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে ৫ হাজার ৫৪৯টি। অযান্ত্রিক নৌকা রয়েছে আরও ১ হাজার ২৩৫টি। স্থানীয় ফিশিং বোটমালিকদের হিসাবে ছোট-বড় মিলিয়ে ট্রলারের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত মানুষের সংখ্যা এক লাখের বেশি।
কক্সবাজার ফিশিং বোটমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, বড় একটি ট্রলারে ২০ থেকে ৩০ এবং মাঝারি ট্রলারে ১৫ থেকে ২২ জন পর্যন্ত জেলে থাকেন। ফলে একটি ট্রলার দুর্ঘটনায় পড়া মানে শুধু একটি নৌযানের ক্ষতি নয়, একসঙ্গে বহু পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষের জীবন অনিশ্চয়তায় পড়া।
কোস্ট গার্ডের সাবেক কর্মকর্তা ফখরুল ইসলামের মতে, ট্রলারে জিপিএস ট্র্যাকার থাকলে নির্দিষ্ট সময় পরপর অবস্থান তীরে পাঠানো সম্ভব। ডিজিটাল ক্রু তালিকা থাকলে ট্রলারে কতজন মানুষ ছিলেন, সেটিও দ্রুত জানা যাবে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য ধরে সম্ভাব্য অনুসন্ধান এলাকা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
স্টারলিংক কি খুলতে পারে নতুন দরজা: এ যোগাযোগ-শূন্যতার জায়গাতেই স্যাটেলাইটনির্ভর ইন্টারনেট ‘স্টারলিংক’ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আইটি বিশেষজ্ঞরা। তবে আইটি বিশেষজ্ঞ তানভির হাসান যোহা মনে করেন, স্টারলিংক কোনো জাদুর কাঠি নয় এবং এটি উদ্ধারকারী যন্ত্রের বিকল্পও নয়। SOS বা EPIRB-এর জায়গাও এটি নিতে পারবে না। কিন্তু জিপিএস, ভিএইচএফ মেরিটাইম রেডিও, জরুরি সংকেতব্যবস্থা, আবহাওয়া সতর্কতা ও কেন্দ্রীয় মনিটরিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে এটি সাগরে জেলেদের নিরাপত্তায় নতুন একটি যোগাযোগ স্তর তৈরি করতে পারে।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে থাকা ট্রলারে সরাসরি আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ঝড়ের সতর্কতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি বার্তা পাঠানো সম্ভব হতে পারে। প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ জেলেকে খুঁজে বের করা নয়, বরং দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে একটি ট্রলারকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। তানভির হাসান যোহার পরামর্শ, একবারে জেলার হাজার হাজার ট্রলারে প্রযুক্তি বসানোর বদলে পরীক্ষামূলকভাবে ‘স্মার্ট ফিশিং ট্রলার’ প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
স্টারলিংকের বাংলাদেশি বিজনেস পেজের তথ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল প্রায়োরিটির ৫০ জিবি প্যাকেজের মাসিক মূল্য ৩২ হাজার টাকা। ৫০০ জিবি প্যাকেজের মূল্য ৮৪ হাজার, ১ টেরাবাইট ১ লাখ ৪৯ হাজার এবং ২ টেরাবাইটের মূল্য ২ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে হার্ডওয়্যার ব্যয়। ছোট ট্রলার মালিকের পক্ষে এককভাবে এ ব্যয় বহন করা কঠিন। তবে সব ট্রলারে বড় ডেটা প্যাকেজ প্রয়োজন নাও হতে পারে। জিপিএস ট্র্যাকিং, জরুরি বার্তা ও আবহাওয়া সতর্কতার মতো সীমিত ডেটা ব্যবহারের ব্যবস্থা করলে ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকতে পারে।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, সরকারি ভর্তুকি, ট্রলার মালিক সমিতির যৌথ অর্থায়ন, মৎস্য অধিদপ্তরের প্রকল্প, বীমা কোম্পানির অংশগ্রহণ কিংবা উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় এ প্রযুক্তির জন্য যৌথ তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
এক দশকে ১২৯ ট্রলারডুবি: বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত তথ্য মিলিয়ে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারের সাগরে অন্তত ১২৯টি ট্রলারডুবির খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ২২৭ জেলের মৃত্যু এবং ১১৩ জন নিখোঁজ হওয়ার তথ্য বিভিন্ন উৎসে উঠে এসেছে। একই সময়ে প্রায় ১ হাজার ১৮০ জেলেকে জীবিত উদ্ধারের তথ্যও রয়েছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষ্য, সাগরের ঢেউ থামানো যাবে না, ঝড়ের গতিপথও মানুষের হাতে নেই। কিন্তু বিপদে পড়া একজন জেলে যেন যোগাযোগহীন হয়ে না পড়েন, সেই নিশ্চয়তা তৈরির প্রযুক্তি এখন হাতের নাগালে।





