শেষ ঠিকানার কারিগর

এলাকার কারও মৃত্যুর খবর পেলেই খুন্তি-কোদাল, দা, স্কেল আর করাতসহ কবর খোঁড়ার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে ছুটে যান সরওয়ার আলম। কবর খোঁড়ার পর মৃত ব্যক্তির পরিবারের কারও কাছ থেকে নেন না পারিশ্রমিক বা যাতায়াত খরচ। সবাই সম্মান করে তাকে। এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন শেষ ঠিকানার কারিগর হিসেবে।
কবর খোঁড়ার এমন আত্মিক কাজে তৃপ্তি পান সরওয়ার। এককভাবে প্রায় ৭ বছর কবর খোঁড়ার পর হঠাৎ একদিন একসঙ্গে দুই জায়গায় কবর খোঁড়ার সংবাদ পান তিনি। একটি কবর খুঁড়তে পারলেও একই সময় হওয়ার কারণে অন্যটি খুঁড়তে না পারার আক্ষেপ থেকে যায় তার। একসঙ্গে একাধিক কবর খোঁড়ার তাড়না থেকে বিয়ানীবাজার পৌরশহরের কসবা-খাসা গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘শেষ ঠিকানা’ নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এক দিনে একাধিক কবর খোঁড়ার প্রয়োজন হলে গ্রুপে বিভক্ত হয়ে সব কবর খোঁড়েন সরওয়ারের সংগঠনের সদস্যরা।
মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে বাঁশ কাটা থেকে শুরু করে কবর খোঁড়া শেষ করে দাফন পর্যন্ত সেখানে থাকেন সরওয়ার আলম। তার ডায়রিতে লেখা তথ্য অনুযায়ী, তিনি এ পর্যন্ত ৫ হাজারের ওপর কবর খুঁড়েছেন। শুধু দুই গ্রামেই নয়, বিয়ানীবাজার পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় মৃত্যুর খবর শুনলেও ছুটে যান তিনি। কারও মারা যাওয়ার খবর প্রচারের জন্য মাইকসেটও কিনেছেন তিনি।
কসবা গ্রামে জন্ম নেওয়া সরওয়ারের স্ত্রী একজন চাকরিজীবী এবং তাদের রয়েছে এক পুত্র ও কন্যাসন্তান। পুত্র বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন।
কসবা গ্রামের মিলাদ মুহাম্মদ জয়নুল ইসলাম জানালেন, সরওয়ারের এমন কাজে মুগ্ধ এলাকার সবাই। রাত-দিন যেকোনো সময়, আবহাওয়া যেমনই থাকুক, তিনি কবর খুঁড়তে বের হয়ে পড়েন।
পৌরসভার কাউন্সিলর সায়ফুল ইসলাম ঝুনু বললেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্বাবলম্বী। কবর খুঁড়ে কারও কাছ থেকে হাদিয়া বা টাকা-পয়সা নেন না। মৃতের বাড়িতে কুলখানি অনুষ্ঠানেও খেতে যান না সরওয়ার।
খাসা গ্রামের বাসিন্দা আবুল হাসান বললেন, ‘আমাদের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামে কেউ মারা গেলে আর কেউ সংবাদ না পেলেও সরওয়ার ভাই ঠিকই সংবাদ পেয়ে যান। এরপর সরঞ্জাম নিয়ে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে হাজির হন।’
সরওয়ার আলম বললেন, ‘শখের বশে কবর খুঁড়তে খুঁড়তে এখন নেশা হয়ে গেছে। কোথাও মানুষ মারা যাওয়ার খবর পেলেই মনটা ছটফট করে। এখন এই কাজ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, চাইলেও মৃত্যুর সংবাদ শুনে ঘরে বসে থাকতে পারব না।
‘আমি চাই, আমি না থাকলেও আমার সংগঠনের সদস্যরা বিনা পয়সায় মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে দিয়ে আসবে। আমার সংগঠনের প্রতিটি সদস্য আমার মতো কবর খোঁড়ার কাজ করে আনন্দ পায়।’





