‘এত বড় কথা’ বলে এজলাস থেকে উঠে যান প্রধান বিচারপতি

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের এককথায় আপিল বিভাগে ঘটল বিরল এক ঘটনা। খানিক বাগবিতণ্ডার পর এজলাস ছেড়ে উঠে গেলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তার সঙ্গে এজলাস ছাড়েন আপিল বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরাও।
আজ মঙ্গলবার এই ঘটনার পর বার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন যে বক্তব্য সাংবাদিকদের দেন, তার সঙ্গে ভিন্নতা পাওয়া যাচ্ছে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের কথায়।
সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন দাবি করেন, তিনি আইনজীবীদের স্বার্থে কথা বলার সময় ঘটনার সূত্রপাত হয়। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বললেন, আদালতে মাহবুব উদ্দিনের বক্তব্যে এমন কিছু ছিল না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাত সদস্যের আপিল বিভাগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।
আজ আপিল বেঞ্চ এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করার পর অন্য একটি মামলার শুনানির সময় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন।
তিনি এই জরিমানা মওকুফের আবেদন করে আদালতের উদ্দেশে বলেছিলেন, একজন আইনজীবী জরিমানার এই টাকা কোথা থেকে দেবেন?
উপস্থিত আইনজীবীদের ভাষ্য অনুসারে, একপর্যায়ে মাহবুব উদ্দিন আদালতকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’
তার সেই বক্তব্য প্রধান বিচারপতি শুরুতে ‘লাইটলি’ নেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতি তখন মাহবুব উদ্দিনকে প্রশ্ন করেন- ‘আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) কি এটা মিন করেন?’
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্যে, তখন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন একই কথা বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনি যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসোলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’
এ কথা বলে প্রধান বিচারপতি এজলাস থেকে উঠে যান বলে জানান রুহুল কুদ্দুস কাজল। তখন তাতে অনুসরণ করেন অন্য বিচারকরা।
এই ঘটনার পর দুপুর ১২টার দিকে হাইকোর্টের বর্ধিত ভবনের সামনে আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন সাংবাদিকদের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। এরপর দুপুর সোয়া ২টার দিকে অ্যাটর্নি জেনারেল তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন।
কী নিয়ে সূত্রপাত
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আপিল বিভাগে আজ নম্বর ক্রমিকে হাইকোর্ট বিভাগে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার নিয়োগসংক্রান্ত একই ইস্যুতে একাধিক রিট মামলার বিষয় ছিল। তথ্য গোপন এবং প্রতারণার অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩০ দিনের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে।
সকালে এই আদেশের পর দুপুরে আরেকটি মামলার শুনানিতে এ জরিমানার টাকা মওকুফের আবেদন করেন মাহবুব উদ্দিন খোকন। তখনই বাগবিতণ্ডা ও এজলাস ত্যাগের ঘটনা ঘটে।
২০১৩ সালে একজন কাজি নিয়োগ থেকে ঘটনার শুরু হওয়ার কথা জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘যেখানে মামলার বাদী পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে। পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন, অথচ পূর্বে রিজেক্ট হওয়ার আদেশটি পরবর্তী রিটে উল্লেখ করা হয়নি। যে কারণে নারী আইনজীবীকে আজ আপিল বিভাগ ফাইন করেছেন পাঁচ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে পাঁচ লাখ টাকা।’
তিনি বলেন, ওই নারী আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী মামলায় সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন মাহবুব উদ্দিন খোকন।
‘সকালে যখন আদেশ হয়, তখন নারী আইনজীবী আমার পাশে বসে আদেশটি শুনেছেন; মাহবুব উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন না।’
সকাল সোয়া ৯টার দিকে আদেশ হয় জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আর এ ঘটনার (এজলাস ত্যাগ) অবতারণা হয়েছে ১২টা ৩৫ মিনিটের সময় .. অন্য একটি মামলার সময়।’
যা বলেছিলেন মাহবুব উদ্দিন
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলছিলেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি মাননীয় প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আসলে মামলাটামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে। এতে লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে। উনি একজন জুনিয়র লইয়ার, ৫ লাখ টাকা কস্ট দেওয়াটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। উনাকে মাফ করে দেওয়া হোক।
‘‘তখন উনি বললেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর কি লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে?’ ইনকাম ওই সেন্সে কমে গেছে... আমি আসলে উনাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম... বিভিন্ন সময় উনার সামনেও বলেছি, আগে ১১ জন বিচারপতি ছিল আপিল বিভাগে, তিনটা বেঞ্চ ছিল। তিনটা বেঞ্চে সবসময় আমরা মামলা শুনানি করতাম। এখন একটা বেঞ্চ।’’
আপিল বিভাগে মামলার ধীরগতি নিয়ে আইনজীবীদের স্বার্থেই কথা বলেছিলেন বলে দাবি করেন আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন।
তিনি বলেন, একটি মামলায় স্থগিতাদেশ হলে অনেক সময় সেই মামলার শুনানি হয় না দীর্ঘদিন। ফলে মামলাটি বিচারাধীন থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। রিট, আপিল কিংবা অন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় শুনানি হওয়ার সুযোগও অনেক সময় তৈরি হয় না।
‘চেম্বার জজের দেওয়া স্টে অর্ডারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। একটি মামলার শুনানি করার জন্য আমি নিজেই গত এক বছরে চারবার চেম্বার জজের আদালতে আবেদন করেছি। কিন্তু সেই শুনানি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।’
আইনজীবীদের সংকটের চিত্র তুলে ধরে মাহবুব উদ্দিন বলছিলেন, মামলার শুনানি না হলে আইনজীবীরা কাজ করতে পারেন না। ক্লায়েন্টের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। কারণ একজন আইনজীবী তো বিচারপ্রার্থীর হয়ে মামলা পরিচালনা করতেই আদালতে আসেন।
‘আমি প্রধান বিচারপতির কাছে আইনজীবীদের এই সমস্যাগুলোর কথা বিনয়ের সঙ্গে তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু তিনি বিষয়টি ভিন্নভাবে নিয়েছেন,’ বলেন তিনি।
তার দাবি, মামলার শুনানি না হওয়ায় আইনজীবীরা যে পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাই প্রধান বিচারপতির কাছে তুলে ধরেন তিনি।
‘আমি এসব কথা বলেছি ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং আইনজীবীদের অধিকার ও পেশাগত পরিবেশের কথা বিবেচনা করে। আমি সবসময় প্রকাশ্যেই এসব কথা বলি। নতুন বিচারপতিদের সংবর্ধনা কিংবা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক, যেখানেই সুযোগ পেয়েছি, আইনজীবীদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছি।
ভিন্ন কথা বললেন অ্যাটর্নি জেনারেল
মাহবুব উদ্দিনের বক্তব্যের সোয়া ২ ঘণ্টা পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনি (মাহবুব উদ্দিন) আইনজীবীদের কল্যাণে ও স্বার্থে কিছু কথা প্রধান বিচারপতির কাছে বলেছেন বলে দাবি করেছেন। আসলে এমন কোনো কথা আজকের মামলার প্রসিডিংয়ে (কার্যধারা) হয়নি।’
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘মাহবুব উদ্দিন খোকন ওই প্রসঙ্গে (জরিমানা আরোপ) বললেন যে ‘একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দেখেন, আমরা সবকিছুতে দেখেশুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না। কারণ ওনাদের (আদালত) বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে।’ এ পরিস্থিতিতে বললেন, ‘আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) এটা বলবেন না’।”
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আপিল বিভাগে আমরা যত কথাই বলি না কেন, আমাদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হতে পারে। কখনো কখনো আদালত আমাদেরকে বকা দেন, আমরা তো আর সেভাবে রিয়্যাক্ট করি না। এখানকার সৌন্দর্যটা হচ্ছে এটা।
‘তবে মাহবুব উদ্দিন খোকন তার ব্রিফিংয়ে আইনজীবীদের কল্যাণে, আইনজীবীদের বিল্ডিং, আইনজীবীদের সুযোগ-সুবিধা, আইনজীবীদের জন্য যে সমস্ত কথা বলেছেন, আজকের ঘটনাপ্রবাহের সময় তিনি এ সমস্ত কোনো বিষয়ই উল্লেখ করেননি।’
রুহুল কুদ্দুস আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা, সততা প্রাধান্য দেন। কোনো প্রতারণা যদি দেখেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন।






