বার সভাপতির বক্তব্য ঘিরে বাগ্বিতণ্ডা, এজলাস ছাড়লেন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা

ফাইল ছবি
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী প্রধান বিচারপতি হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি এমন মন্তব্য করার পর দুপক্ষের মধ্যে ব্যাপক বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের পুরো বেঞ্চ এজলাস ত্যাগ করেন।
আজ মঙ্গলবার মামলার শুনানিকালে ঘটে এ ঘটনা।
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আপিল বিভাগের ১ নম্বর আইটেমে হাইকোর্ট বিভাগে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার নিয়োগসংক্রান্ত একই ইস্যুতে একাধিক রিট মামলা করা হয়। তথ্য গোপন এবং প্রতারণার অভিযোগে রিটকারী মো. নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট দশ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩০ দিনের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে।
এ জরিমানার টাকা মওকুফের আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। একজন আইনজীবী জরিমানার এই টাকা কোথা থেকে দেবেন, এমন প্রশ্ন তুলে তা মওকুফের দাবি করেন ব্যারিস্টার খোকন। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার শুরুর একপর্যায়ে ব্যারিস্টার খোকন আদালতকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’
পরে ব্যারিস্টার খোকন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আপিল বিভাগে সকাল বেলা ১ নম্বর আইটেমে এক নারী আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করছে। তখন আমি প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি মাননীয় প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আসলে মামলা-টামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে। এতে লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে। উনি একজন জুনিয়র ল’ইয়ার, ৫ লাখ টাকা কস্ট দেওয়াটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। উনাকে মাফ করে দেওয়া হোক।’
তখন উনি বললেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর কি লইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে?’ ইনকাম ওই সেন্সে কমে গেছে... আমি আসলে উনাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম... বিভিন্ন সময় উনার সামনেও বলেছি, আগে ১১ জন বিচারপতি ছিল আপিল বিভাগে, তিনটা বেঞ্চ ছিল। তিনটা বেঞ্চে সবসময় আমরা মামলা শুনানি করতাম। এখন একটা বেঞ্চ।’
ব্যারিস্টার খোকন আরও বলেছেন, একটি মামলায় স্টে অর্ডার হলে অনেক সময় সেই মামলার শুনানি হয় না দীর্ঘদিন। ফলে মামলাটি বিচারাধীন থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। রিট, আপিল কিংবা অন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় শুনানি হওয়ার সুযোগও অনেক সময় তৈরি হয় না।
‘চেম্বার জজের দেওয়া স্টে অর্ডারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। একটি মামলার শুনানি করার জন্য আমি নিজেই গত এক বছরে চারবার চেম্বার জজের আদালতে আবেদন করেছি। কিন্তু সেই শুনানি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। শুধু আমার মামলা নয়, অনেক আইনজীবীকেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে’, যোগ করেন খোকন।
আইনজীবীদের সংকটের চিত্র উল্লেখ করে খোকন বলছিলেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আইনজীবীদের ওপরও। মামলা শুনানি না হলে আইনজীবীরাও কাজ করতে পারেন না। ক্লায়েন্টের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। কারণ একজন আইনজীবী তো বিচারপ্রার্থীর হয়ে মামলা পরিচালনা করতেই আদালতে আসেন।
‘আমি প্রধান বিচারপতির কাছে আইনজীবীদের এই সমস্যাগুলোর কথা বিনয়ের সঙ্গে তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু তিনি বিষয়টি ভিন্নভাবে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার প্রধান বিচারপতি হওয়ার কারণে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে, এমন বক্তব্য তিনি গ্রহণ করেন না। অথচ আমরা সেটা বোঝাতে চাইনি। আমাদের বক্তব্য ছিল, মামলা শুনানি না হওয়ায় আইনজীবীরা পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন’, পরিষ্কার করেন ব্যারিস্টার খোকন।
একসময় আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চে ১১ জন বিচারপতি মামলা শুনতেন। এখন বিচারপতির সংখ্যা কমে গিয়ে কার্যত একটি বেঞ্চে বিপুলসংখ্যক মামলা পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। চেম্বার জজ কোনো মামলার শুনানির জন্য তারিখ ও আইটেম নির্ধারণ করে দিলেও অনেক সময় সেই মামলা শুনানি পর্যন্ত গড়ায় না। এতে বিচারপ্রার্থীদের পাশাপাশি আইনজীবীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
‘কোনো মামলার শুনানি বা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে তদবিরকে যদি প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেটি সুপ্রিম কোর্টের জন্য কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এতে বিচারপ্রার্থীদের খরচ বাড়ে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে’, বলছিলেন ব্যারিস্টার খোকন।
খোকনের ভাষ্য, অনেক সময় জুনিয়র আইনজীবীদের ওপর বড় অঙ্কের কস্ট আরোপ করা হয়। একজন নারী জুনিয়র আইনজীবীর ওপরও পাঁচ লাখ টাকা কস্ট আরোপ করা হয়েছে। আমি মনে করি, একজন আইনজীবীর মামলা জেতা বা হারা স্বাভাবিক বিষয়। শুধু সেই কারণে বড় অঙ্কের কস্ট আরোপ করা কতটা যৌক্তিক, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
‘আমি এসব কথা বলেছি ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং আইনজীবীদের অধিকার ও পেশাগত পরিবেশের কথা বিবেচনা করে। আমি সবসময় প্রকাশ্যেই এসব কথা বলি। নতুন বিচারপতিদের সংবর্ধনা কিংবা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক, যেখানেই সুযোগ পেয়েছি, আইনজীবীদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছি’, পরিষ্কার করেন ব্যারিস্টার খোকন।





