স্বাস্থ্যব্যবস্থা হবে প্রতিরোধকেন্দ্রিক: ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে বাজেট বাড়ানো, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরিবর্তনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এই নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।
আগামীর সময়: সরকার স্বাস্থ্য খাতের কোন বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ২০টি প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা এই খাতের পুরনো জঞ্জাল দূর করে ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গঠনে সহায়ক হবে। স্বাস্থ্য খাতের আইনি কাঠামো সুশাসন শক্তিশালী করা, স্বচ্ছতা আনা, দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা, সমন্বয়হীনতা সমস্যার সমাধান এর মধ্যে অন্যতম।
দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা খুব দুর্বল। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চিকিৎসাকেন্দ্রিক থেকে সরিয়ে প্রতিরোধকেন্দ্রিক করতে নানান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের হাসপাতালকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সেবার মান ভালো করা; যাতে দেশের মানুষের বাইরে চিকিৎসা করতে না যেতে হয়। এখন দেশের মানুষ প্রতি বছর ৭-৯ বিলিয়ন ডলার খরচ করে দেশের বাইরে চিকিৎসায়। সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেরও অনেক দুর্বলতা আছে, সেজন্য মানুষ বাইরে চলে যায়।
আগামীর সময়: গত ১৮০ দিনে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: ১৮০ দিনের সফলতা বলতে গেলে শুরুতেই আসবে স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের কথা। বাজেট আগের তুলনায় দ্বিগুণ করা হয়েছে, যা পরবর্তী চার-পাঁচ বছরে ক্রমান্বয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে গরিব-মধ্যবিত্তরা সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। চেষ্টা চলছে হাসপাতালের খরচ কমানোর। ওষুধের মান ভালো করা, সহজলভ্য করা বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে।
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেই পূর্ণাঙ্গ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অ্যাম্বুলেন্স আছে। কিছু ইমার্জেন্সি রুম আছে। কিন্তু কম্প্রিহেনসিভ কোনো জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নেই। এটা কীভাবে যুক্ত করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ করছি।
আগামীর সময়: রেফারেল ব্যবস্থা চালুর কথা শুনছিলাম...
জিয়াউদ্দিন হায়দার: স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করা হবে, যাতে প্রত্যেক নাগরিক হেলথ কার্ডের মাধ্যমে সেবা পাবে; যেখানে ব্যক্তির চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব তথ্য থাকবে। ইলেকট্রনিক রেফারেল সিস্টেম থাকবে, যাতে রোগী দ্রুততম সময়ে সঠিক জায়গায় যেতে পারে। চিকিৎসকদের উপস্থিতি, রোগী দেখার হার পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। এটি সরকারের প্রথম বছরের মধ্যেই করা হতে পারে।
আগামীর সময়: ১ লাখ নার্স, ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি নতুন কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো ৫০ থেকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। হাসপাতালের ছাদে সোলার এনার্জির ব্যবস্থা করা হবে, যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যে না পড়তে হয়। একটি ইউরোপীয় ব্যাংকের সঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট চুক্তিতে যাচ্ছি, যাতে তাদের আর্থিক সহযোগিতায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ক্যানসার কর্নার করা হবে, যাতে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসার দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং একটা প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারে।
জেলা হাসপাতালগুলোতে ১০ বেডের কিডনি ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা থাকবে। টারশিয়ারি লেভেলের সাধারণ চিকিৎসা জেলা হাসপাতালে শেষ করতে সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে সংস্কারের জন্য এই অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আগামীর সময়: প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এখানে নতুন কী করা হচ্ছে?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি ইউনিয়নে একটা করে হেলথকেয়ার ইউনিট থাকবে। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডেও এই ইউনিট থাকবে। প্রতিটি ইউনিটে একটা প্রাইমারি হেলথকেয়ার সেন্টার থাকবে। তার নিচে তিনটি কমিউনিটি হাব থাকবে। এখনকার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো কমিউনিটি হাবে রূপান্তর করা হবে। হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এরই মধ্যে হেলথকেয়ার সেন্টার এবং হাবের নকশা চূড়ান্ত করেছে। প্রাইমারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অর্গ্যানোগ্রাম করা হয়েছে, যা সর্বশেষ অনুমোদনের অপেক্ষায়। আশা করি, প্রথম বছরের মধ্যেই এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশে হাব নির্মাণ করে জনবল নিয়োগ শেষে সেবা শুরু করা যাবে।
আগামীর সময়: স্বাস্থ্যের সুশাসনের বিষয়ে সরকার কী ভাবছে?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: এতদিন শহর এলাকায় স্বাস্থ্যের দায়িত্বে ছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এটি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক ধরনের টানাপড়েন চলছিল। আর দুই মন্ত্রণালয়ের মাঝে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছিল স্বাস্থ্যব্যবস্থা। এটি সমাধান করতে শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিল তিন ধরনের পরিচালকের অধীনে। স্বাস্থ্য সহকারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের, পরিবার কল্যাণ সহকারী পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এবং কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডাররা কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের অধীনে। তাদের কাজ সহজ করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সভাপতি করে একটা কমিটি করা হয়েছে, যার অধীনে তিনটি ক্যাডার একীভূত করা হয়েছে কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড ওয়েল বিয়িং ওয়ার্কার নাম দিয়ে। তারা মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।
আগামীর সময়: চিকিৎসক-রোগীদের সুরক্ষা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে অনেক সমস্যা। হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিগ্রহ, সহিংসতার শিকার হয়। অনেক সময় রোগীরাও সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে অবহেলার শিকার হয়। কিন্তু কোনো পক্ষেরই সঠিক আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ ছিল না। এর সমাধানে একটা কমিটি করা হয়েছে, যারা স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের খসড়া করে দিয়েছে। যেটি এখন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করলে মন্ত্রিপরিষদ মিটিংয়ে অনুমোদন পেলে সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হবে। এর আগেই অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে প্রত্যেক উপজেলা-জেলা হাসপাতালে আনসার নিয়োগ করা হচ্ছে।
আগামীর সময়: সরকার স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে কি কিছু ভাবছে?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: স্বাস্থ্যে দুইভাবে অর্থায়ন করা হয়। একটা ট্যাক্স বেজড, একটা ইন্স্যুরেন্স বেজড। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষাসেবা দেওয়া প্রাথমিকভাবে সরকারের দায়িত্ব। তাই এটি ট্যাক্স বেজড ফাইন্যান্সই থাকতে হবে। তবে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতালে যে শয্যাগুলো খালি থাকে, সেগুলোতে সরকারি তত্ত্বাবধানে যেন রোগী সেবা নিতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হবে।
আগামীর সময়: চ্যালেঞ্জ কেমন?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: ১৮০ দিন হয়েছে, কিন্তু আমরা হাতে টাকা পেয়েছি জুলাই থেকে। স্বাস্থ্যে চ্যালেঞ্জ অনেক। গত ১৭ বছরের অনিয়ম, দুর্নীতি; অনেক সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, পদায়নে প্রচুর জটিলতা। দুর্নীতি কমাতে নার্স-চিকিৎসকদের বদলির কাজ অটোমেশনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে, এতে হিউম্যান ইন্টারভেনশন কম হবে। স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতি সুযোগ সীমিত হবে।
আগামীর সময়: সিন্ডিকেট ভাঙা যাবে?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। দুর্নীতির লাগাম অনেক জায়গায় টেনে ধরেছি। সেটি আরও ধরতে হবে। শেখ হাসিনার সরকারে অবকাঠামো নির্মাণকাজের দিকে বেশি নজর ছিল। আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যেই সেসব করা। নতুন অবকাঠামো বানানোর আগে যে অবকাঠামো বানানো আছে, সেটাতে প্রয়োজনীয় জনবল, আর্থিক সহায়তা, সরঞ্জাম দিয়ে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা আমাদের উদ্দেশ্য।
আগামীর সময়: দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আপনাদের হাম মোকাবিলা করতে হয়েছে?
জিয়াউদ্দিন হায়দার: আমরা ক্ষমতায় আসার পরই হাম পেলাম। ২০-২১ সালে করোনার কারণে সঠিকভাবে কাভারেজ হয়নি। পরিকল্পনার ঘাটতি অথবা এর গুরুত্ব বুঝতে না পারায় ২৫-এ এসে টিকার ক্যাম্পেইন হয়নি। আমরা এসে ফল ভোগ করলাম। কিছুই করার ছিল না। তবে এটি সম্ভবত বিশ্বে নজির যে হামের রিপোর্ট পাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই গাভি, ইউনিসেফের সহায়তায় হামের টিকার ব্যবস্থা করতে পেরেছি। এক মাসের মধ্যে টিকার লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ করেছি, এটি জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে বড় সাফল্য।
আগামীর সময়: আর কিছু যোগ করার আছে...
জিয়াউদ্দিন হায়দার: ১৮০ দিনের বড় অংশ চলে গেছে স্বাস্থ্য খাতে জমা ময়লা পরিষ্কারে। তারপরও বলব, আমরা অনেক কিছু করেছি। মন্ত্রীমহোদয় সারা দেশে ছোটাছুটি করছেন, যা থেকে অনেক বার্তা আসছে। দালালদের খপ্পর কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে এতে সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই। সাংবাদিকদের সহযোগিতা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দরকার, যাতে স্বাস্থ্য খাতে একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে।
আগামীর সময়: আপনাকে ধন্যবাদ।
জিয়াউদ্দিন হায়দার: আপনাকেও ধন্যবাদ।





