পৃথিবী বদলে গেছে

আমি যদি বলি, এ মাসের ৪ তারিখ থেকে আমাদের চেনা দুনিয়াটা বদলে গেছে, সেটা অত্যুক্তি হবে বটে, তবে পুরোপুরি মিথ্যা হবে না। এদিন জাতিসংঘ বিশ্বের একটি নতুন এবং ‘সঠিক’ মানচিত্র অনুমোদন করেছে, যেখানে মহাদেশগুলোর তুলনামূলক আকারের ভুল সংশোধন করা হয়েছে। ‘ভুল’ না বলে মিথ্যাচারও বলা যায়।
আমরা আসলে মানচিত্রের মধ্য দিয়ে এতদিন একটা ভুল বা মিথ্যা পৃথিবী দেখছিলাম। সেখানে গ্রিনল্যান্ডকে দেখানো হচ্ছিল আফ্রিকা মহাদেশের চেয়ে বড় করে। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে ১৪ গুণ বড়। এরকম আরও নানা মিথ্যাচার ছড়িয়ে আছে আমাদের চিরচেনা মানচিত্রে, যেটা এতদিন ধরে আমাদের স্কুল-কলেজে আর পড়ার ঘরের দেয়ালে টানানো আছে।
এরকম হলো কেন? কেন একটা ভুল মানচিত্র আমরা এতকাল ধরে ব্যবহার করে আসছি?
সে এক লম্বা গল্প। সেই গল্পের মধ্যে মানচিত্র তৈরির বিদ্যা যেমন আছে, একই সঙ্গে আছে ক্ষমতার ইতিহাস, ঔপনিবেশিক খবরদারি, মিথ্যাচার আর প্রতারণার কাহিনি।
ব্রিটিশ লাইব্রেরির মানচিত্র বিভাগের প্রধান পিটার বারবারকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মানচিত্র কী? তিনি বলেছিলেন, মানচিত্র হলো বিশাল আকৃতির মিথ্যাচার। যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি এক-অনুপাত-এক স্কেলের মানচিত্র তৈরি করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি মানচিত্র আসলে কোনো না কোনোভাবে সাবজেকটিভ, মানে ওটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার।
কথা ঠিক। মানচিত্র তৈরি মানেই কিছু জিনিস বেছে নিয়ে কিছু জিনিস ফেলে দেওয়া। কারণ, আপনি একটি বর্তুলাকার জিনিসকে একটি সমতলপৃষ্ঠার ওপর সাজিয়ে দেখাচ্ছেন। তা করতে গিয়ে নানা কিছু বিকৃত করতে হচ্ছে আপনাকে।
সেদিক থেকে দেখলে মানচিত্র তৈরির সঙ্গে কবিতা অনুবাদ করার অনেক মিল পাওয়া যাবে। কবিতা অনুবাদ মানেই হলো এক ভাষার তল থেকে অর্থকে অন্য একটি ভাষার তলে স্থাপন করা। তা করতে গিয়ে মানচিত্রের প্রক্ষেপণের মতোই সংকটে পড়েন অনুবাদক। সবকিছু অক্ষত রেখে কবিতাকে কখনোই ভাষান্তর করা যায় না। একটি ভাষার এমন কিছু অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য থাকে, যেগুলো ঠিক অনুবাদযোগ্য নয়। তা ছাড়া উপমা-উৎপ্রেক্ষাগুলো ঠিক রাখবেন, নাকি ছন্দ ঠিক রাখবেন— এ ধন্দে পড়তে হয় অনুবাদককে। অনুবাদ কবিতা সে কারণে মূল কবিতার একটা অপভ্রংশ মাত্র।
মানচিত্রও একধরনের বিকৃত রিপ্রেজেন্টেশন।
পৃথিবীর অনেক বিকল্প মানচিত্র বহুকাল ধরে চালু ছিল। অন্য মানচিত্রগুলোকে হটিয়ে চারশ বছর ধরে একটাই মানচিত্র এমনভাবে চালু হয়ে গেছে, পৃথিবীর ভূখণ্ডগুলোর সত্যিকার চেহারা হিসেবে এটাই আমাদের কল্পনায় স্থায়ী আসন গেড়েছে। কার্টোগ্রাফি বা মানচিত্রবিদ্যায় পৃথিবীর এই মানচিত্রটিকে বলে মার্কাটরস প্রজেকশন। বাংলায় বলা যায়, মার্কাটরের প্রক্ষেপ। ফ্লেমিশ মানচিত্রবিশারদ জেরারদুস মার্কাটর ১৫৬৯ সালে যখন এই মানচিত্রটি তৈরি করেন, তখন এটার মূল লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশের রেখাগুলোকে গ্রাফচিত্রের মতো সমকোণে পরস্পরছেদী সরলরেখা হিসেবে তুলে ধরা। মার্কাটর এটি তৈরি করেছিলেন ইউরোপীয় নাবিকদের সমুদ্রযাত্রার সুবিধার কথা চিন্তা করে। আর তা করতে গিয়ে তিনি ভূখণ্ডগুলোর আপেক্ষিক আয়তনকে বিকৃত করেছেন। বাণিজ্য আর উপনিবেশবাদী স্বার্থচরিতার্থই এই বিকৃতির অভিমুখ ঠিক করে দিয়েছে। উত্তর গোলার্ধের ভূখণ্ডগুলো এখানে বড় করে দেখানো হয়েছে দক্ষিণ গোলার্ধের ভূখণ্ডগুলোর চেয়ে। তা ছাড়া চীন ও ভারতকে ছোট দেখিয়ে ইউরোপকে আরেকটু বড় করে দেখানোর তাগিদের পেছনে ছিল প্রভু মনোভাবের তুষ্টিলাভ। তিনি আসলে একটি ভিজ্যুয়াল হায়ারার্কি তৈরি করেছেন। মার্কাটরের এই মানচিত্র এ কারণেই অন্যগুলোকে টেক্কা দিয়েছে। এটিই টিকে গেছে।
কিন্তু মার্কাটরের মানচিত্রের ভুল সংশোধন করে আরেকটি মানচিত্র চালু করলে কি আমরা আসলেই একটি সত্য মানচিত্র পাব? সেটায় কোনো মিথ্যাচার বা বিকৃতি থাকবে না?
পিটার বারবারের মতে, প্রতিটি মানচিত্রই কোনো না কোনো বিকৃতি ধারণ করে। বিকৃতিহীন সত্য মানচিত্র হতে হলে সেটাকে এক-অনুপাত-এক স্কেলের মানচিত্রই হতে হবে। কিন্তু সে জিনিসটা কী? বাংলাদেশ ভূখণ্ডটির কথা ধরা যাক। এই ভূখণ্ডের এক-অনুপাত-এক মানচিত্র হবে হুবহু বাংলাদেশের সমান, যেখানে মানচিত্রের এক মাইল মানে হবে বাস্তবের এক মাইল। মানচিত্রবিদ্যার চোখে এটাই হবে বাংলাদেশর সবচেয়ে নিখুঁত ও আদর্শ মানচিত্র।
কথা হলো, সেই মানচিত্রটি আপনি রাখবেন কোথায়? মেলে ধরবেন কীভাবে? এরকম একটি মানচিত্র কি আদৌ ব্যবহার করা সম্ভব?
দুনিয়ার সবচেয়ে নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করলে কী কাণ্ড দাঁড়াবে, সেটা সবচেয়ে ভালোভাবে উঠে এসেছে আর্জেন্টাইন লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসের একটি গল্পে। গল্পের নাম ‘অন দ্য এক্সাটিচ্যুড ইন সায়েন্স’ বা ‘বিজ্ঞানের অভ্রান্ততা’।
গল্পটিতে বোর্হেস এমন এক সাম্রাজ্যের কথা শুনিয়েছেন, যার মানচিত্রকরদের নিখুঁত মানচিত্র তৈরির পাগলামিতে পেয়ে বসেছিল। একপর্যায়ে তারা ওই সাম্রাজ্যের এমন মানচিত্র তৈরি করে ফেলে, যেটা হুবহু ওই সাম্রাজ্যটির সমান। কিন্তু এমন মানচিত্র কোনো কাজেই লাগেনি। পরবর্তী প্রজন্মের শাসকরা এতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং মানচিত্রটি তারা একটি মরুভূমিতে ফেলে রাখেন। সেখানে ধুলায় গড়াগড়ি খেয়ে, মানুষ আর গবাদি পশুর পায়ে পায়ে শতচ্ছিন্ন হয়ে এখনো সেটি পড়ে আছে।





