আদিবাসী বহ্নিশিখাদের বঞ্চনার ময়দান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চাপানো সবুজ বিপ্লবের পর বর্তমানে বোরো মৌসুম ধানের প্রধান মৌসুম। বোরো মৌসুমের ধানই আমাদের থালার বেশিরভাগ পূরণ করে। আমাদের থালায় ভাত জোগায় কে? মূলত সাঁওতাল, মুণ্ডা, কডা, কোল, কড়া, মুসহর, মাহালি, পাহাড়িয়া, ওঁরাও, খাড়িয়া, কর্মকার, ভূমিজ, হাজং, বানাই, মান্দি, ডালু ও কোচ নারীরা। ধান চাষের সবচেয়ে পরিশ্রম ও দক্ষতার পর্বটি হলো জালা রোয়া। রাজশাহী, রংপুর, সিলেট কিংবা ময়মনসিংহ বিভাগের গ্রামে গ্রামে বোরো মৌসুমে আদিবাসী নারীদের এ কর্মমুখর দৃশ্য বাংলাদেশের মুখস্থ। ভাতের পর চায়ের প্রসঙ্গ আসে। আমাদের কাপে চায়ের লিকার কারা জোগায়? চা বাগানের বঞ্চিত বন্দি আদিবাসী চা শ্রমিক নারীরা। আধা মণ-এক মণ ওজনের চা পাতার বস্তা মাথায় নিয়ে বাগানের নালায় পড়ে মীরা হাজরাদের মতো যাদের নিদারুণ মরণ হয়। মধুপুরের আনারস আজ দেশের এক গর্বিত ভৌগোলিক নির্দেশনা (জিআই)। অথচ ১৯৫০ সালে বন বিভাগ যখন জোর করে মধুপুরে জুম আবাদ নিষিদ্ধ করে, তখন ইদিলপুর গ্রামে এক মান্দি নারী মিজি মৃ এই আনারসের মিশ্রবাগানের প্রচলন করেছিলেন। আজ তার উত্তরসূরি বাসন্তী রেমার কলাবাগান কেটে ফেলে বন বিভাগ।
খাদ্য ও পানীয় গেল, বস্ত্রের আলাপে আসা যাক। মণিপুরী শাড়ি, চাকমা বেইন তাঁতের কাপড়, মান্দি দকমান্দা, রাখাইন তাঁত কিংবা বম চাদর দেশের বস্ত্রশিল্পে ঐতিহ্য এবং কারুপণ্য হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে অবদান রেখে চলেছে— যার কারিগর মূলত বিভিন্ন আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নারীরা।
পাহাড়, বন, ঝিরি, প্রাণবৈচিত্র্য এবং বুনো খাদ্যবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় আদিবাসী নারীদের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে অগ্রগণ্য। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের জরিপে দেশে বহমান ৪১টি মাতৃভাষার হাতেখড়ি হয় মূলত পরিবারের নারীদের মাধ্যমেই। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বর্মাছড়ার ভেরোনিকা ও খ্রিষ্টিনা কেরকেটাই এখনো টিকিয়ে রেখেছেন খাড়িয়া ভাষা। এ দুই নারী ছাড়া খাড়িয়া ভাষাকে ধরে রাখার তাগিদ আর কেউ কেন করেনি— এই প্রশ্ন করা জরুরি।
নারী ফুটবলে দেশকে কারা বারবার জিতিয়ে দেয়? ঋতুপর্ণা চাকমা, মারিয়া মান্দা কিংবা স্মৃতি কিসকুর মতো গরিব আদিবাসী কন্যারা। ২০২৫-২৬ মৌসুমের নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস প্রতিযোগিতায় রংপুরের এক গরিব সাঁওতাল পরিবারের মেয়ে স্মৃতি কিসকু দেশসেরা হয়েছে।
তেভাগা, টংক, নানকা কৃষক বিদ্রোহে আদিবাসী নারীরা ছিলেন অগ্রগামী। ‘হাজং বিদ্রোহের’ বীর রাশিমনি ও কুমুদিনী হাজং আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন, কৃষকের অধিকার আদায়ে কীভাবে জানবাজি রেখে লড়তে হয়। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি তৎকালীন ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল বাহিনীর গুলিতে শহীন হন রাশিমনি হাজং, দিস্তামনি হাজং, বাসন্তী হাজংসহ প্রায় ১২ জন হাজং বীর। মুক্তিযুদ্ধে খাসি মুক্তি বেটি কাঁকেত হেনইঞতা, রাখাইন মুক্তিযোদ্ধা উ প্রিন্সা খে কিংবা গারো মুক্তিযোদ্ধা সন্ধ্যা রানী সাংমার মতো আদিবাসী নারীদের মুক্তিসংগ্রামের দলিলায়ন এখনো জাতীয় ইতিহাসে গ্রন্থিত নয়।
দেশের কৃষি উৎপাদন, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, কারুশিল্প কিংবা ক্রীড়ায় তুমুল অবদান রাখা আদিবাসী নারীর পরিসর এখনো বঞ্চনা, বৈষম্য ও বাহাদুরিতে বন্দি। টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের গীদিতা রেমা ভূমি বাঁচাতে খুন হন। ঝরা শালপাতা কুড়াতে গিয়ে বন বিভাগের গুলিতে ঝাঁজরা হন মধুপুরের শিশিলিয়া স্নাল। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় পাহাড় থেকে নিখোঁজ হয়ে যান কল্পনা চাকমা। প্রশ্নহীনভাবে ধর্ষিত হন পণেমালা ত্রিপুরা বা ছোট্ট কডা শিশু।
দেশের সব জনসংগ্রামে আদিবাসী নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি থাকলেও রাষ্ট্রের নীতি-কাঠামোতে আদিবাসী নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত। এমনকি নিজস্ব প্রথাগত শাসন কাঠামোতেও আদিবাসী নারীর সক্রিয় নেতৃত্ব ও দৃশ্যমান অস্তিত্ব কম
রাষ্ট্র, সমাজ, এমনকি পারিবারিক পরিসরেও আদিবাসী নারীর ঘাড়ে প্রান্তিকতা ও নিপীড়নের বোঝা। এ বোঝা নামাতে দেশ-দুনিয়াকে খুব কম তৎপর হতে দেখা যায়। ৮ মার্চ নারী দিবস কিংবা ১৫ অক্টোবর বিশ্ব গ্রামীণ নারী দিবসের পর জাতিসংঘ এবারই প্রথম আদিবাসী নারী ও কন্যার অবদান ও সংগ্রামের স্বীকৃতিতে একটি দিবস পালনের সূচনা করল। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ৫ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক নারী ও কন্যা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ এখনো এই দিবসের মর্মবাণী ধারণ করে আদিবাসী নারী ও কন্যাদের বঞ্চনার ক্ষতে হাত রাখেনি; বরং এই দিবসের মাত্র তিন দিন আগে শ্রীমঙ্গল থেকে চা শ্রমিক নেতা গীতা রানী কানুকে আটক করা হয়। চা বাগানে বর্তমান মজুরি ১৮৭ টাকা। ৫০০ টাকা দৈনিক মজুরির দাবিতে তারা আন্দোলন করছিলেন।
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিওলিবারেল, পুরুষালি ও অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক। জাতিসত্তার স্বীকৃতি প্রশ্নে জাতদেমাগি ও বাইনারি। এমন রাষ্ট্রীয় কাঠামো কেবল উপনিবেশিক লিগ্যাসি বহন করে, কর্তৃত্ববাদ জারি রাখে এবং নিম্নবর্গের জন-ইতিহাসের অবদান ও বয়ানকে অস্বীকার করে। তাই রাষ্ট্রে আদিবাসী নারীর বৃহৎ অবদানেরও সামান্য স্বীকৃতি নেই। আদিবাসী নারীর ওপর ঘটিত জুলুম ও বাহাদুরির বিচার নেই।
দেশে আদিবাসী নারীর ওপর চেপে বসা নয়া জুলুমের নাম ‘বিতিকিচ্ছরি পর্যটন বাণিজ্য’। প্রতিটি আদিবাসী অঞ্চলে পর্যটনের নামে আদিবাসী নারীদের পরিসর সংকুচিত ও চুরমার করা হচ্ছে। আদিবাসী মেয়েদের মঞ্চে নাচানো এক প্রশ্নহীন বাহাদুরি। আলোকচিত্র বা নানাবিধ দলিলে আদিবাসী নারীদের উপস্থাপন প্রবলভাবে ‘অপর’ ও ‘বর্ণবাদী’। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা নাগরিক প্রতিক্রিয়া এসব অপরায়ণ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বিস্ময়করভাবে নিশ্চুপ।
সমতল, পাহাড় কি উপকূল কিংবা শহর এলাকাতেও আদিবাসী নারীর প্রান্তিকতা ও বঞ্চনা বহুমুখী। কেবল আদিবাসী নারী হওয়ার জন্য তাদের আরও বেশি বৈষম্য ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়। ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, নিরাপত্তা, কর্মপরিসর, আয়ক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সেবা ও নিরাপত্তাবেষ্টনী— সব ক্ষেত্রেই আদিবাসী নারীর প্রবেশাধিকার সীমিত। নিজস্ব প্রথাগত শাসনকাঠামো থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার বা রাষ্ট্রীয় নীতি ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়ায় আদিবাসী নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ‘অদৃশ্য’।
উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন থেকে কৃষক বিদ্রোহ, মুক্তিযুদ্ধ, ইকোপার্ক, ফুলবাড়ী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ আন্দোলনে আদিবাসী নারীর সাহসী উপস্থিতি ও নেতৃত্ব আদিবাসী সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিকতাকে প্রমাণ করে। দেশের সব জনসংগ্রামে আদিবাসী নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি থাকলেও রাষ্ট্রের নীতি-কাঠামোতে আদিবাসী নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত। এমনকি নিজস্ব প্রথাগত শাসনকাঠামোতেও আদিবাসী নারীর সক্রিয় নেতৃত্ব ও দৃশ্যমান অস্তিত্ব কম। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সার্কেলে কিছু নারী কার্বারি নিয়োগ হলেও তা আশাপ্রদ নয়। সিলেটের খাসিপুঞ্জির কিছু মন্ত্রী বা পুঞ্জিপ্রধান নারী। সমতলের আদিবাসী গ্রামের মৌঞ্জি পরিষদ, পারগানা পরিষদ, মৌঞ্জি হাড়াম, দিঘরী হিসেবে এখনো নারী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি ঘটছে না।
আদিবাসী নারীরা যেমন নিরন্তর প্রতিরোধী হয়েছেন তার ঘরে ও বাইরে, জমিন ও জঙ্গলে, পাহাড়ে ও সমতলে, গ্রাম-সমাজ-দেশ ও রাষ্ট্রে, আদিবাসী নারীদের সেই চিরঞ্জীব প্রতিরোধ আমাদের জীবন জয়ের সাক্ষী। আজকের একেকজন আদিবাসী নারী ও কন্যা সকল অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে একেকজন দ্রোহী বহ্নিশিখা। সরকার ‘রেইনবো নেশন’-এর স্বপ্ন দেখে। আদিবাসী নারী ও কন্যার জীবনে ন্যায্যতা ও সুরক্ষার বলয় নিশ্চিত করার ভেতর দিয়ে এই স্বপ্ন বিকশিত হতে পারে। সরকারকে রংধনুর ভেতর আদিবাসী বহ্নিশিখাদের রঙকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
আমাদের স্মরণ রাখা জরুরি, ফুলমনি ও ঝানো মুর্মু— এ দুই সাহসী সাঁওতাল বোন হুলের মাধ্যমে কিংবা মণিপুরী মেয়ে লীলাবতী সিংহ ভানুবিল আন্দোলন গড়ে তুলে উপনিবেশিক জুলুমের বিরুদ্ধে না দাঁড়ালে আমাদের দাসত্বের ক্ষত আরও গভীর ও মর্মান্তিক হতো। কিংবা আদিবাসী নারীরা যদি অগণিত ভেষজ গাছগাছড়ার ব্যবহারবিধি আবিষ্কার না করত, তাহলে অসুখের হাত থেকে এই সভ্যতা কীভাবে বাঁচত? বাইনারি আর বাহাদুরির চাদর সরিয়ে আদিবাসী নারীর বঞ্চনার ময়দানে দাঁড়ানো জরুরি।
লেখক: গবেষক ও লেখক






