এপারে মৃত্যুর মিছিল, ওপারে নীরবতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২৬ আগস্ট সকালে হিমালয়ের লাংটাং লিরুং পর্বতমালা পাদদেশের কোনো মানুষ সম্ভবত ঘুম থেকে উঠে ভাবেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার পরিচিত পৃথিবীটি আর থাকবে না। পাহাড়ের মাথায় বরফ ছিল, নিচে নদী ছিল, নদীর পাশে ঘর। পাহাড়কে স্থির বলে জেনে আসা মানুষের বহু প্রজন্মের সংসার সেখানে। মানুষ জন্মায়, বুড়ো হয়, মরে যায়— পাহাড় থেকে যায়। কিন্তু সেদিন সেই পুরনো বিশ্বাসটিই ভেঙে দিয়েছিল হিমালয়।
প্রকৃতি নেপাল আর তিব্বত চেনেনি। সীমান্তের পিলার, ভিসা দেখেনি। একই ঢল দুদিকে গেছে। অথচ কয়েক ঘণ্টা পর পৃথিবী যখন বিপর্যয়টি দেখতে শুরু করল, তখন হিমালয়ের দুই পাশে যেন দুটি আলাদা জগৎ। নেপালের দিকে ভয়ংকর হলেও দৃশ্যটি পরিষ্কার। তবে তিব্বতের দিকে দৃশ্যটি ছিল অদ্ভুত নীরবতায় মোড়ানো। সেখানেও একই ধ্বংসের স্রোত ঢুকেছে। কিন্তু পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আরেকটি বাঁধ উঠে গেছে ওইদিকটায়। আর সেটা হলো, ‘তথ্যের বাঁধ’।
লাংটাং পাদদেশের এক পাশে নেপালের রাসুয়া; অন্য পাশে চীনের তিব্বতের জিরং অঞ্চল। ধ্বংসের স্রোতে জিরং সীমান্ত অঞ্চল প্রায় মুছে গেছে। ব্যস্ত বন্দর, রাস্তা, সরকারি ভবন, তীর্থযাত্রীদের চলাচলের জায়গা— সবকিছুই প্রবল কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে দেখেছেন, পাঁচতলা কাস্টম ভবনটির চিহ্নও আর নেই।
বিপর্যয়ের দুদিন পর, ২৮ আগস্ট, যেদিন নেপালে সরকারি মৃত্যুসংখ্যা ৫৩৮। সেদিন তিব্বতের অংশে সরকারি হিসাবে মৃত্যু মাত্র পাঁচ। পরে চীনা কর্তৃপক্ষই ৩১ জনের মৃত্যু ও ৫৩১ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩ দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। সংখ্যার এই বিরাট ব্যবধান মানেই যে চীন মিথ্যা বলছিল— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। ভূগোল আলাদা, জনবসতি আলাদা, ক্ষয়ক্ষতিও সমান হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পার্থক্যটি চোখে পড়ার মতো। নেপালের সংখ্যা যাচাই করার অনেক জানালা খোলা ছিল; তিব্বতের জানালা একটাই; সেটি ‘স্টেট কন্ট্রোল মিডিয়া’।
দ্য গার্ডিয়ান সে সময় লিখেছিল, তিব্বতে কঠোর তথ্য নিয়ন্ত্রণের কারণে পৃথিবীর ওই পাশটিতে বিপর্যয়ের প্রকৃত মাত্রা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালে সাংবাদিকরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষ ও উদ্ধারকারীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। অন্যদিকে তিব্বতে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন শুধু উদ্ধার তৎপরতাকে সামনে আনছিল। গার্ডিয়ান জানায়, নেপাল ও তিব্বতের দুই পাশ থেকে বেরিয়ে আসা তথ্যের পরিমাণে ছিল বিস্ময়কর ব্যবধান।
হেলিকপ্টার কতবার উড়ল, কত কিলোমিটার রাস্তা খুলল— এগুলো সংবাদ। কিন্তু একটি পরিবার ১০ দিনেও কেন স্বজনের খবর পেল না— এটিও সংবাদ। প্রথমটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা; দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রের দায়
লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, তিব্বতের প্রায় সবকিছুকেই বেইজিং জাতীয় নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখে। অর্থাৎ দুর্যোগটি প্রকৃতির; কিন্তু তার বর্ণনাটিও প্রশাসনিক অনুমতির অপেক্ষায় থাকে। রয়টার্স যখন তিব্বতে নিখোঁজ তীর্থযাত্রীদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, তখন রাষ্ট্রীয় হিসাবের বাইরের আরেক পৃথিবী দেখা গেছে। ১০ দিন পার হওয়ার পরও কয়েকটি পরিবার জানত না তাদের আপনজন জীবিত আছে কি না, কোথায় অনুসন্ধান চলছে।
অবশ্য বেইজিং বলেছে, বিপর্যয়ের তথ্য ‘স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী’ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, বিদেশি দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে এবং উদ্ধারকাজে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের উদ্ধার ক্ষমতা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা এক জিনিস নয়। একটি সরকার খুব দক্ষভাবে মানুষ উদ্ধার করতে পারে, আবার একই সঙ্গে সংবাদকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণও করতে পারে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উদ্ধারকারী সৈনিকের ছবি থাকা জরুরি। হেলিকপ্টার কতবার উড়ল, কত কিলোমিটার রাস্তা খুলল— এগুলো সংবাদ। কিন্তু একটি পরিবার ১০ দিনেও কেন স্বজনের খবর পেল না— এটিও সংবাদ। প্রথমটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা; দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রের দায়।
জার্মানির গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের অনুসন্ধান বলছে, জিরং সীমান্ত গেট ভেসে যাওয়ার প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিডিও চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার কিছু অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। ডয়চে ভেলে জানায়, উইচ্যাটে নির্দিষ্ট ভিডিওটির শেয়ার বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সেন্সরশিপ এখন আর শুধু লেখা কেটে দেওয়ার ছুরি নয়; কখনো তথ্যের ঘর এমনভাবে সরকারি তথ্যে ভর্তি করে দেওয়া হয় যে, ঘটনার অন্য পাশটির আর দাঁড়ানোর স্পেস থাকে না।
নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের একটি দিক তাই গভীরভাবে বেদনাদায়ক হয়েও মানবিক। সেখানে ব্যর্থতা গোপন থাকেনি। মৃতদেহ দেখা গেছে। মর্গ ভরে গেছে। মানুষ গণকবর দিয়েছে। সাংবাদিকরা সেই অস্বস্তিকর ছবিও দেখিয়েছেন। কোনো রাষ্ট্রই নিজের মাটিতে শত শত লাশের ছবি পৃথিবীকে দেখাতে চায় না। কিন্তু মৃত মানুষ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির অংশ নয়; সে প্রথমে একজন মানুষ। সত্য তাকে সেই মর্যাদাটুকু ফিরিয়ে দেয়। তিব্বতে এই দুর্যোগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শেষ পর্যন্ত চীন কতজনের মৃত্যু ‘চেপে গেছে’— এটি নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর: কেন এমন একটি তথ্যব্যবস্থা থাকবে, যেখানে প্রকৃত সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করার পথ এত সংকীর্ণ?
‘দ্য অ্যাভালাঞ্চ অ্যান্ড দ্য সাইলেন্স’ নিবন্ধে সাবেক তিব্বতি কূটনীতিক খেদরুপ থনডুপ লিখেছেন, ‘নিহত কিংবা নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রকাশ নিয়ে রাষ্ট্র যখন গড়িমসি করে, তখন মানুষের মৃত্যু সরকারি নথিতেও অদৃশ্য হয়ে যায়। তিব্বতের ক্ষেত্রে তিনি এটিকে প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তথ্য নিয়ন্ত্রণের অংশ বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, তিব্বতি মালভূমি ও হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে তথ্য যদি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের আড়ালে থাকে, তার প্রভাব সীমান্তে আটকে থাকবে না। পাহাড়ের ওপরে কী ঘটছে, সে তথ্য শুধু তিব্বতের মানুষের নয়; সেটা ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষেরও জানার অধিকার রয়েছে। কারণ ওখানে জন্ম নেওয়া অনেক নদীর শেষ গন্তব্য বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে।
লেখক: সাংবাদিক





