এবার এল ‘চান্দাবিডি’, ১৩ দিনে ৬২১ অভিযোগ
- ফুটপাত থেকে নির্মাণকাজ, সর্বত্র চাঁদার অভিযোগ
- সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ঢাকায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোথায় চাঁদা চাওয়া হয়েছে, কত টাকা চাওয়া হয়েছে, কীভাবে চাওয়া হয়েছে— অভিজ্ঞতাটি শুধু নিজের মধ্যে না রেখে এবার তা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। যার নাম ‘চান্দাবিডি’। যেখানে নাম-পরিচয় প্রকাশের ভয় নেই, থানায় গিয়ে অভিযোগের ঝক্কিও নেই। শুধু ঘটনার স্থান, ধরন আর টাকার অঙ্ক জানালেই চান্দাবিডির মাধ্যমে অভিযোগ পৌঁছে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের কাছে ।
চালুর মাত্র ১৩ দিনে চান্দাবিডিতে জমা পড়েছে শত শত অভিযোগ। সাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট চালুর পর গত সোমবার রাত ১০টা পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়েছে অন্তত ৬২১টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে দাবি করা চাঁদার মোট অঙ্ক প্রায় ১৮ কোটি ৬১ লাখ ৬৩ হাজার ৬২ টাকা।
মজার বিষয় হলো, এত বড় একটি উদ্যোগের পেছনে কারা আছে, তাদের পরিচয় বা ঠিকানা ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে দেওয়া নেই। তবে সাইটে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাঁদাবাজির অভিযোগ এক জায়গায় নথিভুক্ত করতেই এ উদ্যোগ। অভিযোগ করতে কোনো অ্যাকাউন্ট, লগইন, নাম, ফোন নাম্বার বা ইমেইলও লাগে না।
৫ লাখ থেকে ২০০ টাকা— চাঁদার বিচিত্র চিত্র
চান্দাবিডিতে প্রকাশিত অভিযোগগুলো দেখলে চাঁদাবাজির ধরন ও পরিমাণের বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার নামে কার্ডপ্রতি ৫ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় এক ব্যক্তি। তার দাবি, টাকা না দিলে কার্ড হবে না— এমন ভয় দেখানো হচ্ছে। অভিযোগে কয়েকজনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
কুমিল্লার দৌলতপুর চৌমুহনীর একটি নির্মাণকাজ ঘিরে উঠেছে আরও বড় অঙ্কের অভিযোগ। সেখানে পাইলিংয়ের কাজ করতে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়েছে। টাকা দেওয়ার পর কাজ করার সুযোগ মিললেও পরে অন্য একটি পক্ষ নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমিক তাদের কাছ থেকে নেওয়ার শর্ত দেয়। এতে কাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি অভিযোগকারীর।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের চিত্র আবার ভিন্ন। সেখানে রবিবারের মেলায় দোকান বসানো হকারদের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, টাকা না দিলে দোকান বসানোর জায়গা পাওয়া যায় না। অথচ অনেক হকারের দৈনিক লাভই কয়েকশ টাকার বেশি নয়।
শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশ কেন্দ্রের কাছ থেকেও উঠেছে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ। সেখানে রাস্তার ওপর টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসে কয়েক ব্যক্তি প্রতি অটোরিকশা থেকে ২০০ টাকা করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার থানতলি এলাকায় জায়গা কিনে বাড়ি করতে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সেখানে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ কোথাও লাখ লাখ, কোথাও আবার কয়েকশ টাকা— অভিযোগের ধরন বদলালেও একটি বিষয় একই; নির্দিষ্ট জায়গায় কোনো না কোনোভাবে অর্থ দাবি বা আদায়ের অভিযোগ।
অভিযোগের অঙ্কে এগিয়ে ঢাকা
চান্দাবিডির বিভাগভিত্তিক তথ্য বলছে, অভিযোগের আর্থিক অঙ্কে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ। মোট দাবি করা চাঁদার প্রায় ৬৬ শতাংশই এই বিভাগে। এখানে প্রকাশিত হয়েছে ২৬৯টি অভিযোগ, যার মোট অঙ্ক ১২ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ৯৬০ টাকা।
এরপর রয়েছে খুলনা বিভাগ। ৪১টি অভিযোগে দাবি করা অর্থ ২ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার ৭০ টাকা, যা মোট অঙ্কের ১১ দশমিক ১ শতাংশ।
চট্টগ্রামে ১৩৭টি অভিযোগে দাবি করা অর্থ ১ কোটি ৫৭ লাখ ৭৬ হাজার ৩৩ টাকা। রাজশাহীতে ৫৫টি অভিযোগে ১ কোটি ৭ লাখ ৪৩ হাজার ২৮০ এবং রংপুরে ৪১টি অভিযোগে ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার ৮৮০ টাকা।
সিলেটে ২০টি অভিযোগে দাবি করা অর্থ ৩৪ লাখ ১১ হাজার ৫৬৪ টাকা। বরিশালে ৩৩টি অভিযোগে ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৫৩৫ এবং ময়মনসিংহে ২৫টি অভিযোগে ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৭৪০ টাকা।
জেলার হিসাবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ঢাকায়— ১৪২টি। এরপর চট্টগ্রামে ৪৪, নারায়ণগঞ্জে ৩৪, কুমিল্লায় ৩৩, গাজীপুরে ২২, মুন্সীগঞ্জে ১৭, নোয়াখালীতে ১৬, ময়মনসিংহ ও বগুড়ায় ১৫টি করে এবং খুলনায় ১৪টি অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জোর করে টাকা আদায়ের
অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণ করলেও উঠে আসে চাঁদাবাজির নানা চিত্র। চান্দাবিডির তথ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ ২৩৪টি, যা তালিকাভুক্ত অভিযোগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে চাঁদা দাবির ২০৩টি অভিযোগ। ঘুষ দাবি বা গ্রহণের অভিযোগ ৬৭, হুমকি বা ভয় দেখানোর অভিযোগ ৫৯ এবং অন্যান্য ধরনের অভিযোগ রয়েছে ৫৬টি।
পরিচয় গোপন, অভিযোগ পৌঁছাবে কর্তৃপক্ষের কাছে
প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ করার ক্ষেত্রে অনেকেই ভয় পান। সে জায়গাটিই ধরতে চায় চান্দাবিডি। সাইটটিতে অভিযোগ জানাতে নাম, ফোন নাম্বার কিংবা ই-মেইল দিতে হয় না। বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা থানা, আনুমানিক অবস্থান, ঘটনার ধরন, দাবি করা অর্থ, ফল ও ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। চাইলে প্রমাণ হিসেবে ছবিও যুক্ত করা যায়।
সাইটসংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলো প্রকাশের আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হয়। ভুয়া বা অসংলগ্ন তথ্য বাদ দেওয়ার পর অভিযোগ প্রথমে সংশ্লিষ্ট থানায় এবং একই সঙ্গে জেলার পুলিশ সুপার ও বিভাগীয় পুলিশ অফিসে ই-মেইল করা হয়। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও, যেমন আইজিপির কাছে, কপি পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই— কোনো অভিযোগ যেন শুধু থানার ফাইলেই আটকে না থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, ঘুষ ও চাঁদাবাজির বড় একটি অংশ নীরবে ঘটে। ভুক্তভোগীরা নানা কারণে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না। তার মতে, পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকায় এ ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের সেই ভয় কিছুটা কাটাতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো যাচাই করে পুলিশ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখতে পারে।
মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে কোথায় কত চাঁদা
চান্দাবিডির নতুন সংযোজন ‘চাঁদার ম্যাপ’। মানচিত্রে বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা থানাভিত্তিক অভিযোগের অবস্থান দেখা যায়। নির্দিষ্ট চিহ্নে মাউস রাখলে বা মোবাইল স্পর্শ করলে দাবি করা অর্থের পরিমাণ দেখা যায়। আবার চিহ্নে ক্লিক করলে বেরিয়ে আসে ঘটনার স্থান, ধরন, দাবি করা অর্থ, ফল ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ। ফলে বিচ্ছিন্ন অভিযোগগুলো এখন শুধু আলাদা গল্প নয়; একটি মানচিত্রে পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগের চিত্র। তবে এই প্ল্যাটফর্মের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও এখানেই— অভিযোগের সংখ্যা নয়, অভিযোগের সত্যতা এবং সেগুলোর পরবর্তী আইনগত পরিণতি। কারণ একটি অভিযোগ অনলাইনে প্রকাশ হওয়া আর একটি অপরাধ প্রমাণিত হওয়া— এক বিষয় নয়।





