ফাস ফাইন্যান্স
৯৯.৯৯% খেলাপি অস্তিত্ব নেই জামানতের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফান্ড তছরুপ ও জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ বিতরণের কারণে গভীর সংকটে নিমজ্জিত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর শঙ্কার তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিতরণ করা মোট ঋণ ও বিনিয়োগের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি। অথচ বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে যেসব সম্পদের কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে তার বেশিরভাগেরই কোনো মূল কাগজপত্র নেই। নিরীক্ষকের মতে, অধিকাংশ ঋণ নথিতে মূল দলিল, নামজারি ও কর পরিশোধের রসিদের ঘাটতি রয়েছে, যা জামানতের অস্তিত্ব নিয়ে জন্ম দিয়েছে সন্দেহের।
নিরীক্ষক কাজী আহমেদ মনোয়ার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ফাস ফাইন্যান্সে ভয়াবহ তহবিল তছরুপ ও জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ বিতরণের ঘটনা শনাক্ত হয়। ফলে ২০১৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক আর্থিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। তহবিল তছরুপের কারণে আমানতকারীদের সময়মতো অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা কোম্পানিটি হারিয়েছে। পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হয়েছে নতুন সম্পদ তৈরি ও আমানত সংগ্রহ।
নিরীক্ষক আরও বলেছেন, কোম্পানিটির দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হস্তক্ষেপ করেছে। আর্থিক অবস্থা গভীরভাবে মূল্যায়নের পর বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি কোম্পানিটির অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো কোম্পানিটির হাতে পৌঁছায়নি, তবে নিরীক্ষকের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ হলো, নিকট ভবিষ্যতে কোম্পানিটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
আর্থিক সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে মূলধন পর্যাপ্ততার হিসাবেও। ২০২৫ সালের শেষে ফাস ফাইন্যান্সের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৩১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় হার ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকার কথা। একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩১ টাকা ৭১ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে ঋণাত্মক ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সায় নেমে এসেছে। আগেই দেখানো হয়েছে, কোম্পানির মোট ঋণ ও বিনিয়োগের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশই খেলাপি।
বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে জামানতের মূল্য বিবেচনা করে কোম্পানি ৮৭৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা সঞ্চিত প্রভিশন হিসাব করেছে। কিন্তু নমুনাভিত্তিক যাচাইয়ে অধিকাংশ ঋণ নথিতে মূল দলিল, নামজারি এবং সরকারি খাজনা পরিশোধের রসিদের যথেষ্ট ঘাটতি পেয়েছেন নিরীক্ষক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির সঞ্চিত মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৪১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এই সময়ে কোম্পানিটির মোট দায় মোট সম্পদের চেয়ে ২ হাজার ১৫৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা বেশি ছিল। পাশাপাশি পরিচালন নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ১৫ কোটি ৩ লাখ টাকা, যা ইঙ্গিত দেয় তীব্র নগদ অর্থ সংকটের।
উদ্বেগের বিষয় হলো, কোম্পানি এসএলআর হিসাবে যে ২৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা সংরক্ষণের কথা জানিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ কোটির বেশি টাকা ছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, প্রিমিয়ার লিজিং এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত। নিরীক্ষকের মতে, এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা দুর্বল হওয়ায় ওই অর্থ আদায় নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে। এর পাশাপাশি ফাস ফাইন্যান্সের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রাখা প্রায় ১৪৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের অস্তিত্বও নিরীক্ষক স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেননি।
অন্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এজেন্টদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের মধ্যে ১৮৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বিপরীতে কোম্পানি কোনো ঋণ বিবরণী দিতে পারেনি। পাশাপাশি অনিয়মের চিত্র মিলেছে রাজস্ব খাতেও। কোম্পানিটি উৎসে কর, ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য ৯৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা পরিশোধযোগ্য দেখালেও তা জমা দেয়নি যথাসময়ে।
এসব বিষয়ে জানতে ফাস ফাইন্যান্সের কোম্পানি সচিব মো. আইনুদ্দিনকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।





