ডেঙ্গু নিয়ে কীটতত্ত্ববিদদের শঙ্কাই সত্য হতে চলেছে!
- সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেই ডেঙ্গুর চূড়া
- ভয়াবহতায় ২০২৪-২৫ সালকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা। থেমে থেমে বৃষ্টি। এই আবহাওয়া যেন ডেঙ্গুর জন্য এক স্বর্গরাজ্য। আগেই শঙ্কা দেখছিলেন কীটতত্ত্ববিদরা। এবার তা সত্যি হতে চলেছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছুঁতে পারে সর্বোচ্চ চূড়া।
চলতি বছরে এরই মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪৬ হাজার। প্রাণ গেছে ১৩৩ জনের। যার বড় একটি অংশ নারী। মৃত ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছে তরুণরাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪-২৫ সালের রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে এবারের প্রাদুর্ভাব। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে— এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন খোদ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত। গতকাল বুধবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনা সভায় ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে এমন মন্তব্য করলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
একই রকম পূর্বাভাস দিয়েছিলেন দেশের কীটতত্ত্ববিদ এবং জনস্বাস্থ্যবিদরাও। তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে জুলাই থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। আগস্টে সে ধারা আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে গিয়ে ডেঙ্গু নেবে আরও ভয়াবহ রূপ। এ সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়বে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোলরুমের দেওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াদের মধ্যে ৭২ জনই নারী। ডেঙ্গুতে মৃত ব্যক্তিদের বেশিরভাগই তরুণ এবং কর্মক্ষম বয়সের।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার আগামীর সময়কে বললেন, ‘ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করতে একটি পূর্বাভাস মডেল রয়েছে, যেটি ১০ বছর ধরে দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পূর্বাভাসের ফলাফল সঠিক হচ্ছে।’
বৃষ্টিপাতের ধরন ও পরিমাণ, তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা, এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা— ডেঙ্গু পূর্বাভাস মডেলের পাঁচটি পরামিতি বলে জানালেন এই কীটতত্ত্ববিদ। তিনি বললেন, ‘এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ভয়াবহতায় ২০২৪-২৫ সালকে ছাড়িয়ে যাবে। তবে ২০২৩ সালের চেয়ে সংক্রমণ কম হবে। ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সালেই সবচেয়ে বেশি রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ১৭০৫ জনের।’
কবিরুল বাশার বলছেন, এবার লম্বা সময় ধরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এমন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এডিস মশার প্রজনন উপযোগী। সারা দেশেই ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার নেওয়ার মতো এডিস মশার লার্ভা দেখা যাচ্ছে। রোগী বেশি থাকার কারণে সংক্রমণ বাড়বে।
কীটতত্ত্ববিদ এবং জনস্বাস্থ্যবিদদের আগাম সতর্কবার্তা আমলে নিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজীর আহমেদ। তার ভাষ্য, তাহলে হামের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট হওয়ার সুযোগ পেত না। বিশাল জনসংখ্যার দেশে হাম-ডেঙ্গু একসঙ্গে সামলানো কঠিন। এতে মৃত্যু ও ভোগান্তি বাড়বে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টয় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে এসেন ১ হাজার ৪৬৩ ব্যক্তি। মারা গেছে তিনজন। একজন ঢাকায়, একজন ময়মনসিংহে, একজন রংপুরে। গত মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬ জন। অথচ চলতি মাসের প্রথম ৯ দিনেই রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৯২ জন। গত মঙ্গলবার এক দিনে মশাবাহিত এ রোগে মারা গেছে ৯ জন, আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৫৭১ জন, যা এ বছরে এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড।
রাজধানী শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানালেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। রোগীর চাপে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ভর্তি করা যাচ্ছে না। চলতি বছরের ৭ আগস্ট পর্যন্ত এই হাসপাতালে ৩২৮ রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সেবা নিয়েছে, যার মধ্যে মারা গেছে দুই শিশু।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে হাসপাতালে শয্যা, স্যালাইন ও ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের সংকট দেখা দিতে পারে বলেও শঙ্কা প্রতিমন্ত্রীর। তিনি বললেন, ‘দুই মাস আগে থেকেই এসব স্টক করেছি। এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতিতে কার্যক্রম চলছে, তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডেঙ্গু টেস্ট কিট এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে স্যালাইন মজুদ রয়েছে। পরে যেন এ সরবরাহ অব্যাহত থাকে, সে ব্যবস্থাও নিয়েছি।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, সরকার এডিস মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণের তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তার কিছু ইতিবাচক ফলাফলও অবশ্য দেখা যাচ্ছে। তবে এতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমবে না।
এই জনস্বাস্থ্যবিদ বছর জুড়ে মশার প্রজননস্থল একই রকম গুরুত্ব দিয়ে ধ্বংস করা এবং রোগীদের সেকেন্ডারি লেভেলের হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিলেন। এতে মৃত্যুর হার কমবে বলে মনে করেন তিনি।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশ জুড়ে তিন মাসের অভিযান পরিচালনা করবে সরকার। আগামী শনিবার সকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবস বাস্তবায়ন উপলক্ষে গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানালেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।





