আমি মডার্ন গান খুব পছন্দ করি

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বংশধর শেখ সাদী খান। ছবি : সাজ্জাদ হোসেন
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর বংশধর শেখ সাদী খান। দুবার জাতীয় চলচিত্র পুরস্কারজয়ী এই সংগীত পরিচালক পেয়েছেন একুশে পদক। তার সঙ্গে আলাপ করেছেন ওমর শাহেদ ও আখলাকুজ্জামান অনিক। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ তো আপনার আত্মীয়।
তিনি আমার সেজ চাচা। ‘জ্যাঠামশাই’ ডাকতাম। আমার দাদা সফদর আলী খানের মাধ্যমে এই পরিবারে সংগীত এসেছে। তিনি সেতার বাজাতেন। তার ছেলে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর গান-বাজনার প্রতি খুব ঝোঁক ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুরের বিখ্যাত খাঁ পরিবারের মধ্যে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁই প্রথম বাড়ি ছাড়েন। অনেক ঘাট পেরিয়ে শেষে ভারতের মধ্যপ্রদেশের মাইহারের রাজদরবারের থিতু হলেন। সেখানে তানসেনের বংশধর ওয়াজির খাঁর কাছে তিনি ৩০ বছর তালিম নিয়েছিলেন।
আপনার বাবাও তো বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ?
আমার বাবা ওস্তাদ আয়েত আলী খান। বাবাকে ওয়াজির খাঁ সাহেবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন জ্যাঠামশাই। ২০ বছর ওয়াজির খাঁর কাছে তালিম নিয়েছেন। এর পর কোলকাতায় একটি কনফারেন্সে বাজানোর সুযোগ পান। ওই অনুষ্ঠানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন। তার বাদন শুনে রবি ঠাকুর তাকে শান্তিনিকেতনের সংগীতের বিভাগে অধ্যাপনার দায়িত্বটি নেওয়ার অনুরোধ করেন। বাবা শান্তিনিকেতনে সম্ভবত বছর দুয়েক ছিলেন। তারপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে সংগীতের যন্ত্রগুলো বানানোর জন্য একটি কারখানা করলেন। নিজেই যন্ত্র তৈরি করতে পারতেন। দুটি যন্ত্র আবিষ্কারও করেছিলেন। একটি মনোহারা, আরেকটি মন্ত্রবাহার। আর খাঁ সাহেব (আলাউদ্দিন খাঁ) যে সরোদ বাজাতেন, সেটির সংস্কার বাবাই করেছেন। এখন যে সরোদ সারা পৃথিবীতে মানুষ বাজাচ্ছে, এটি আমার বাবারই তৈরি করা মডেল। আমাদের কারখানা থেকে তখন সংগীতের যন্ত্রগুলো বিক্রির জন্য কলকাতায় পাঠানো হতো।
ভাইয়ের বাসা থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দূরত্ব মাইল দেড়েক। খুঁজতে খুঁজতে সেই বাড়িতে গেলাম। গিয়ে আপেল মাহমুদ, আবদুল জব্বার, রথীন (রথীন্দ্রনাথ রায়), কাদেরী কিবরিয়া, সুজেয় শ্যামকে পেলাম। তারা সবাই আমাকে পেয়ে খুব খুশি
আপনারা ভাইয়েরা তো বিখ্যাত।
আমার বাবার ৯ সন্তান। আমরা ছয় ভাই ও তিন বোন। ভাইয়েরা সবাই সংগীতকেই পেশা হিসেবে নিয়েছি। বোনেরা শিখলেও এই পেশায় আসেনি। আমার সবচেয়ে বড় ভাই ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান সরকারি সংগীত কলেজের সংগীতশিক্ষক এবং রেডিওতে মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। মেজ ভাই ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান প্রখ্যাত সরোদবাদক। আমার গুরু। ভারতে থাকতেন। সেখানে বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ঋত্বিক ঘটকের সব চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক তিনিই। সেজ ভাই মোবারক হোসেন খান ছিলেন সাবিনা ইয়াসমীনের বোন ফৌজিয়া ইয়াসমীনের স্বামী; শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৩০। তিনি কমনওয়েলথ পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। আমার পরিবারে ৩০ থেকে ৩৪টি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার আছে। ভাইবোনদের মধ্যে আমার অবস্থান চতুর্থ। আমার ওপরে আবেদ হোসেন খান, বাহাদুর খান, মোবারক হোসেন খান। এখন দুই ভাই আর এক বোন বেঁচে আছি।
আপনার সংগীত শেখার শুরু কীভাবে হলো?
আমার তালিমও বাবার হাতেই হয়েছে। তার কাছে প্রথমে তবলায় তালিম নিয়েছি ছয় বছর। তারপর বাবা একদিন বললেন, ‘তোমার ভাইদের মধ্যে কেউ তো বেহালা বাজায় না। তুমি বেহালা যন্ত্রটা বাজাও, শেখো।’ আমার অন্য ভাইয়েরা সরোদ, সেতারই বেশি বাজাতেন। বাবার কাছে কিছুদিন বেহালার তালিম নিলাম। কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনে প্রাথমিকের লেখাপড়া শুরু করেছিলাম। বাবা কুমিল্লায় জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন।
এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। ওখানে নবম থেকে দশম শ্রেণিতে যখন উঠলাম, আমাকে কেউ কন্ট্রোল করতে পারত না! খুব ডানপিটে, দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম। পড়াশোনা ঠিকভাবে করতাম না। বাবা আমার ওপর বিরক্ত হয়ে গেলেন। সেজ ভাইকে বলে দিলেন, ‘তোমরা ওকে ঢাকায় নিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দাও। টাকা-পয়সা আমি দেব।’ আমি মোবারক ভাইয়ের ঢাকার বাসায় এলাম ১৯৬৩ সালে। ভর্তি হলাম ধানমন্ডি হাই স্কুলে। ওখান থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম। একটা বিষয়ে ফল খারাপ হলো। পরে অবশ্য সরকারি সংগীত কলেজ থেকে আই মিউজ (ইন্টরমিডিয়েট অব মিউজিক), বি মিউজ (ব্যাচেলর অব মিউজিক) পাস করেছিলাম।
ম্যাট্রিকে রেজাল্ট খারাপ হওয়ার পর কী করলেন?
মেজ ভাই বাহাদুর হোসেন খান তখন প্রতি বছরই একবার দেশে আসতেন। যখন আমাকে নিয়ে পারিবারিক দরবার বসে গেল, সে সময় তিনিও উপস্থিত ছিলেন। বড় ভাইয়েরা বলাবলি করলেন, ‘সাদীকে পাহারা দিয়ে রাখার মতো অত সময় আমাদের নেই। কেননা আমাদের চাকরি ও সংসার আছে, ছেলেমেয়ে আছে।’ মেজ ভাই এই অবস্থা দেখে বড় ভাই আবেদ হোসেন খানকে বললেন, ‘তার তো মনটা এমনিতেই খারাপ। পরীক্ষায় খারাপ করেছে। তাকে আমি কলকাতায় নিয়ে যাই। আমার কাছে কিছুদিন ঘুরে আসুক। এসে আবার পরীক্ষা দেবে।’ সবাই রাজি হলেন। এরপর আমাকে নিয়ে তিনি কলকাতায় চলে গেলেন।
সুবীর নন্দী তখন ব্যাংকে চাকরি করে। তাকে টেলিফোন করলাম, ‘তুমি অফিস শেষ করে আমার বাসা হয়ে যেও। গানটি নিয়ে একটু বসব।’ এটি ১৯৭৫ সালের কথা। সুবীর এলো। এর আগে তার একটি গান হিট হয়েছে ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’। সুবীর বাসায় এলে তাকে বললাম, “আমার কাছে গানটি একদম কবিতার মতো মনে হচ্ছে— ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়/ তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়”
তারপর?
কলকাতায় যাওয়ার ১০ থেকে ১২ দিন পর মেজ ভাই বললেন, ‘তোমার তো বসে থেকে সময় কাটিয়ে লাভ নেই। কিছু একটা করো।’ এরপর বেহালায় পরিপূর্ণভাবে তালিম দেওয়া শুরু করলেন। আমি তার কাছে দুই-আড়াই বছর ছিলাম। তার একটি স্টোররুম ছিল। রুমটি আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এখানে বসে তুমি অনুশীলন করবে।’ সকাল ৮টার সময় উঠেই প্র্যাকটিস শুরু করতাম। ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাজাতাম।
দেশে ফিরলেন কবে?
বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে মেজ ভাইকে বললাম, ‘বাবাকে দেখার জন্য আমি কি একটু দেশে যাব?’ বাহাদুর ভাই বললেন, ‘যাও।’ তারপর বললেন, ‘যতটুকু তালিম আমি তোমাকে দিয়েছি, সেই বিদ্যা দিয়ে তুমি দেশে চলতে পারবে।’ দেশে ফিরলাম। কিছুদিন পর বাবা সুস্থ হয়ে উঠলেন। আমার বাজনা শুনলেন। তখন একটু নিশ্চিত হলেন, ‘আমার এই ছেলেটা আর বোধ হয় বিপথগামী হবে না। বাহাদুর যে তালিমটুকু দিয়ে দিয়েছে, এখন সে যদি চর্চা করে, তাহলে কিছু করতে পারবে।’
আপনার কর্মজীবন কীভাবে শুরু হলো?
এরপর বাবা আমাকে অডিশন দিতে রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামে নিয়ে গেলেন। সেখানে তারও প্রোগ্রাম ছিল। অডিশনে আমাকে বেহালায় ক্লাসিক্যাল সুর বাজাতে দেওয়া হলো। সেখানে আঞ্চলিক পরিচালক, সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক, অনুষ্ঠান আয়োজক, অনুষ্ঠান প্রযোজক, সংগীত প্রযোজক ছিলেন। বাজনা শেষে বাবাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি, তিনি আঞ্চলিক পরিচালকের রুমে গিয়েছেন। ফিরলে বললাম, ‘বাবা, চলেন বাসায় যাই।’ তিনি বললেন, ‘তোমাকে থাকতে হবে। এখানে তোমাকে চাকরি দেবে। মাসে মাসে তোমাকে বুকিং দেবে। প্রতি মাসে বেতন দেবে ২১০ টাকা।’ এটি ১৯৬৫ সালের কথা। সেখানে আধুুনিক গান, ক্লাসিক্যাল ইত্যাদি গানের সঙ্গে বাজাতে হতো। তিন বছর চাকরি করেছি। সেখানে থাকতে থাকতে আধুনিক গানের সঙ্গে বাজানোর, সুর সৃষ্টির ওপর দখল চলে এলো আমার।
খুব ডানপিটে, দুষ্টু প্রকৃতির ছিলাম। পড়াশোনা ঠিকভাবে করতাম না। বাবা আমার ওপর বিরক্ত হয়ে গেলেন
টেলিভিশনে কাজ শুরু করলেন কীভাবে?
১৯৬৮ সালে বড় ভাই আবেদ হোসেন খানের বাসায় বেড়াতে এলাম। তিনি মতিঝিলে সরকারি কোয়ার্টারে থাকতেন। সন্ধ্যার সময় টেলিভিশনে আড্ডা দিতে যেতাম। আমার আত্মীয় রাজা হোসেন খান, ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, ওস্তাদ মীর কাসেম খান, ওস্তাদ ইয়াসিন খান আর ওস্তাদ খুরশিদ খান টেলিভিশনে চাকরি করতেন। তখন বিটিভি একটি নতুন উন্মাদনা। টিভিতে রিহার্সেল দেখি, বাজনা দেখি, প্রোগ্রাম দেখি। টিভিতে অ্যাকর্ডিয়ন বাজাতেন সুজা উদ্দিন। বাজানোর সময় তাকে একটি নোট লাগানোর পরামর্শ দিলাম। তিনি নোট ও মিউজিক বাজানো শেষে বললেন, ‘আপনি তো বেহালা বাজান। টিভিতে চাকরি করবেন? আপনাকে চুক্তিভিত্তিক নেবে। ২৫০ টাকা বেতন দেবে।’ যোগ দিলাম টিভিতে। নিজে ১১০ টাকা রাখি, মাকে দিই ১০০ টাকা। বাকিটা জমাই।
সিনেমাতে কাজ শুরু হলো কীভাবে?
টিভিতে যোগদানের পরপরই চলচ্চিত্রে বাজানো শুরু করলাম। তখন দুটি অর্কেস্ট্রা ছিল এই ভুবনে। ঢাকা অর্কেস্ট্রা আর আমাদের আলাউদ্দিন লিটল অর্কেস্ট্রা। ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান ছিলেন এর প্রধান। আমি নতুন বলে নিয়মিত ওখানে সুযোগ দিতে পারতেন না। যখন বাদক বেশি, মানে পাঁচ থেকে সাতজন লাগত, তখন আমাকে ডাকতেন। তখন সত্য সাহা, খন্দকার নুরুল আলমের মতো সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করা শুরু করলাম। একটি চলচ্চিত্রে বাজালে আমাকে ১৫ টাকা করে দেওয়া হতো। তখন চলচ্চিত্রে সংগীত বাজানোর মতো দক্ষ লোক বেশি ছিল না। আমার ভাই আবেদ হোসেন খানও তখন সংগীত পরিচালক। তিনি ‘নদী ও নারী’ (১৯৬৫) চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। ফলে তখন আমার হাতে প্রচুর কাজ। প্রচুর চলচ্চিত্র বানানো হতো তখন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও তো আপনি বাজিয়েছেন।
১৯৭১ সালে আমি আগরতলা হয়ে কলকাতায় আমার ভাই ওস্তাদ বাহাদুর খানের বাসায় চলে গেলাম। সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমার মা, ভাই, বোন, ভাতিজারা গিয়েছিলেন। ভাইয়ের বাসা থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দূরত্ব মাইল দেড়েক। খুঁজতে খুঁজতে সেই বাড়িতে গেলাম। গিয়ে আপেল মাহমুদ, আবদুল জব্বার, রথীন (রথীন্দ্রনাথ রায়), কাদেরী কিবরিয়া, সুজেয় শ্যামকে পেলাম। তারা সবাই আমাকে পেয়ে খুব খুশি। সেখানে বারীণ মজুমদার, সুবল দত্তকেও পেলাম। আমি তো বেহালা নিয়ে যাইনি। কাপ-প্লেট দিয়ে পারকাশন বাজাতাম। ‘মাঝি বাইয়া যাও রে’ গানের সঙ্গে পারকাশন বাজিয়েছি। ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে’সহ কিছু কোরাসের সঙ্গে ভয়েস দিয়েছি।
স্বাধীনতার পর তো সিনেমার কাজ বেড়ে গেল নিশ্চয়ই?
তখন তো অন্যরকম সময়। প্রচুর চলচ্চিত্র তৈরি হয়। আমাকে চলচ্চিত্রে প্রথম অ্যাসিস্ট্যান্ট মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে নিলেন খন্দকার নূরুল আলম। তিনি দেখলেন, সব জায়গায় আমি আগে নিয়ে গান তুলে ফেলি, সবার আগে গিয়ে বাজাই। িতনি ভাবলেন, আমার মাথা ভালো। বাজানোর পাশাপাশি কম্পোজিশনেরও সুযোগ তিনি আমাকে দিতেন। এসব দেখে আজাদ রহমান একদিন বললেন, ‘সাদী, আমি তো একা। দৌড়াদৌড়ি করতে খুব কষ্ট হয়। তুমি আমার সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্টগিরি করো।’ তার পর থেকে তাদের দুজনের সহকারী হিসেবে কাজ করতে থাকলাম। আর টিভি ছেড়ে রেডিওতে চাকরি নিলাম। মুক্তিযুদ্ধের পর আশফাকুর রহমান খান (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও বাংলাদেশ বেতারের সাবেক উপমহাপরিচালক) আমাকে জোর করে রেডিওতে সংগীত পরিচালকের চাকরি দিলেন।
আপনার প্রথম সুপারহিট গান কোনটি?
১৯৭৪ সালে রেডিওতে ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস চালু হলো। পরিচালক ছিলেন শহীদুল ইসলাম। বাংলাদেশে যত রেডিও স্টেশন আছে, যেমন— খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ইত্যাদি সবকটির ভালো ভালো শিল্পীর গান নিয়ে তিনি রেকর্ডিং শুরু করলেন। আমার ভাগ্যে পড়ল গায়ক সুবীর নন্দী আর গীতিকার ও কবি জাহিদুল হক। জাহিদুল আমাকে একটি গান লিখে ধরিয়ে দিল। সুবীর তখন ব্যাংকে চাকরি করে। তাকে টেলিফোন করলাম, ‘তুমি অফিস শেষ করে আমার বাসা হয়ে যেও। গানটি নিয়ে একটু বসব।’ এটি ১৯৭৫ সালের কথা। সুবীর এলো। এর আগে তার একটি গান হিট হয়েছে ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’। সুবীর বাসায় এলে তাকে বললাম, “আমার কাছে গানটি একদম কবিতার মতো মনে হচ্ছে— ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়/ তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়/ কখনো নদীর মতো তোমার পথের পানে/ বয়ে বয়ে যায়’।” সুবীর বলল, ‘দাদা, গানটির সুর করেছেন?’ বললাম, ‘না, গানটি নিয়ে মনে মনে একটি আইডিয়া এসেছে।’ সে আমার সঙ্গে গাইল। আমি কয়েকবার ইম্প্রোভাইজেশন করলাম। আমরা একটি বাংলা আধুনিক গান তৈরি করলাম। ঢাকার শাহবাগের রেডিও স্টেশনের ৬ নম্বর স্টেশনে গানটি সুজেয় শ্যাম তার প্যানেলে রেকর্ডিং করল। গানটিতে নট ভৈরব রাগটি ব্যবহার করেছি। সুবীর নন্দীর প্রথম সুপারহিট গান হয়েছে আমার সুর করা এই গান। এরপর সত্য সাহা তাকে সিনেমাতে গান করতে নিয়ে গিয়েছেন। এভাবে স্বাধীনতার পর আমাদের, মানে আমার, লাকী আখন্দ, আলাউদ্দিন আলীর গান কিন্তু একটি পরিবর্তন নিয়ে এলো।
‘ওগো বিদেশিনী, তোমার চেরি ফুল দাও’ এটিও তো আপনার সূরে?
আমি কিন্তু মডার্ন গান খুব পছন্দ করি। তখন আমরা ঢাকার ইস্কাটনের গীতিকবি সংসদে আড্ডা মারতাম। আমরা একসঙ্গে বসে হারমোনিয়াম নিয়ে গান করতাম। তখন গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির আসত। তাকে একদিন বললাম, ‘এন্ড্রু কিশোরের একটি প্রোডাকশন আছে। তুই গানটি লেখ। একটি সুন্দর, কমার্শিয়াল গান করতে হবে।’ মনির কিন্তু ভালো কমার্শিয়াল গান লেখে। লেখার পর সে বলেছে, ‘সাদী ভাই, দেখেন তো মুখটি কেমন লাগে— ওগো বিদেশিনী, তোমার চেরি ফুল দাও/ আমার শিউলি নাও, দুজনে প্রেমে হই ঋণী।’ বললাম, ‘ভালো, আগে বাড়ো। অন্তরা লেখো।’ ‘কেমন লাগছে? ধরেন না, হারমোনিয়ামটি ধরেন!’ আমি মনে মনে পড়ছিলাম। আমার অবচেতন মনে একটি সুর খেলা করছিল। কথাগুলো সাজাচ্ছিলাম। এমনটা করতে করতেই হারমোনিয়াম ধরলাম। গাইলাম, ‘ওগো বিদেশিনী, তোমার চেরি ফুল দাও/ আমার শিউলি নাও, দুজনে প্রেমে হই ঋণী/... লা লা লা লা লা লা লা।’ এই গান এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে সুপারহিট হয়েছে।
‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’ তৈরির গল্পটি কেমন?
আমরা ফিরোজ সাঁইসহ সবাই একত্রে আড্ডা দিতাম। একদিন সে আমাকে ধরল, ‘আমি কি আর্টিস্ট না? আমরা গান গাইতে পারি না? আমার জন্য একটি গান করবেন না?’ পাশেই ছিল মনিরুজ্জামান মনির। মনিরকে বলল, ‘আপনি আমার জন্য একটা গান লিখে দেন।’ পরের দিনই মনির লিখল ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা/ বন্ধ হইবে রঙ তামাশা/ চক্ষু মুদিলে/ হায়রে দম ফুরাইলে’। আমার সুর করা গানটি ফিরোজের কণ্ঠে সুপারহিট হয়ে গেল।
কোলকাতার শিল্পীকে নিয়েও তো গান করেছেন?
১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রতিরোধ’ চলচ্চিত্রের গানটি লিখেছেন নজরুল ইসলাম বাবু। গানটির পরিস্থিিত হলো, আমরা সকালের আমেজ নিয়ে একটি গান করব। এই পরিবারের বোনটি মা-বোনের দায়িত্ব পালন করে। রিকশায় বসে বসেই একটি চিরকুটের মধ্যে বাবু লিখল ‘ডাকে পাখি, খোলো আঁখি/ দেখো সোনালি আকাশ/ বহে ভোরের বাতাস’। তারপর গানটি নিয়ে আমি রেডিওর অফিসে ঢুকলাম। কমার্শিয়াল সার্ভিস স্টুডিওতে বসে একটি হারমোনিয়াম নিয়ে গানটি তৈরি করে ফেললাম। প্রযোজক বললেন, ‘আমরা কিন্তু ভারতে গিয়ে রেকর্ডিং করাব। বাংলাদেশ-ভারতের শিল্পী নিয়ে যৌথভাবে কাজ করব।’ ভারতে যাওয়ার পর আমি কলকাতার পাম অ্যাভিনিউতে বাহাদুর ভাইয়ের বাসায় গেলাম। তিনি নিজেই হৈমন্তী শুল্কাকে ফোন করে আমাদের হোটেলে আসতে বললেন। তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে চলে এলেন। আমি গানটি তুলে দিলাম। ১৫-২০ মিনিট কথা বললাম। ৩০-৩৫ মিনিটে গান কমপ্লিট।
আপনার পরিবার?
আমার স্ত্রীর নাম রওশন আরা বেগম। আমরা ১৯৭৩ সালে বিয়ে করেছি। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে রওনক ফেরদৌস খান জোনাক স্ত্রীকে নিয়ে লন্ডন থাকে। তাকে দিয়ে আমার ১৬-১৭টি ছবিতে গান গাইয়েছি। সে খুব ভালো গান করে। আর মেয়ে শাগুফতা জাবিন নূপুর গান না গাইলেও খুব পছন্দ করে। সে ব্যাংক এশিয়ার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।
(৯ জুন, ২০২৬, ধানমন্ডি ঢাকা)








