সুমির উদ্যোগে ১৯২ নারীর ভাগ্যবদল

বাসার কক্ষে অন্যদের সঙ্গে নকশিকাঁথা সেলাই করছেন সুমি মুর্মু
ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ২০১৯ সালে নিজের স্বর্ণালংকার বেচে শুরু করেছিলেন পথচলা। লক্ষ্য ছিল নিজ সম্প্রদায়ের অভাবী নারীদের কর্মসংস্থান, তাদের স্বাবলম্বী করা এবং সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। সেই ছোট উদ্যোগে এখন রাজশাহী নগরীর কয়েরদারা খ্রিস্টানপাড়া আদিবাসী পল্লীর ১৯২ নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের তৈরি নকশিকাঁথা বিক্রির অর্থে সুমি মুর্মু নিজ খরচে রাজশাহীর পবা উপজেলার ভূগরইল ও সন্তোষপুরে চালাচ্ছেন ‘শিশু প্রভাত বিদ্যানিকেতন’ নামে দুটি বিদ্যালয়। সেখানে বিনা খরচে পড়ছে ১২৭ শিশু।
স্বামী ও দুই ছেলে নিয়ে কয়েরদারা খ্রিস্টানপাড়ায় সুমি মুর্মুর বসবাস। গত ৭ সেপ্টেম্বর সুমির বাসায় গিয়ে দেখা যায়, একটি বড় কক্ষে কেউ কাপড় প্রস্তুত করছেন, কেউ নকশা আঁকছেন, কেউ সুতা তৈরি করছেন। কেউ আবার নকশিকাঁথায় ফুটিয়ে তুলছেন নানা নকশা। বেশিরভাগ নারী কাজ বুঝে নিয়ে নিজ বাড়িতে কাঁথা সেলাই করেন।
সুমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করে একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেছেন। কিন্তু চাকরির পাশাপাশি নিজ সম্প্রদায়ের নারীদের জীবন তাকে ভাবাত। তাদের কাছে শুনতেন অভাব, স্বামীর নির্যাতন ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে না পারার কথা।
সুমি বলেছেন, ‘আমরাই যদি না এগিয়ে আসি, তাহলে আমাদের মানুষগুলো এভাবেই পিছিয়ে পড়ে যাবে।’ তিনি দেখলেন, এলাকার অধিকাংশ নারী কমবেশি সেলাই জানেন। সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কয়েক নারীকে দিয়ে নকশিকাঁথা তৈরি শুরু করেন। নিজেই দোকান ও শোরুমে গিয়ে নকশা দেখিয়ে অর্ডার সংগ্রহ করেন। পাঁচ-দশ পিস করে অর্ডার বাড়তে থাকে। বাড়ে নারীর সংখ্যাও। এখন প্রায় ১৯২ নারী এ কাজে যুক্ত।
সাধারণ কাঁথা সেলাইয়ে ১৫ থেকে ১৮ দিন এবং ভারী নকশায় ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। ভারী নকশার কাঁথায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা মজুরি পান নারীরা।
সুমির বাসায় নকশিকাঁথা সেলাই করছিলেন এলিজাবেথ হাসদা। তিনি বললেন, ‘সেলাই করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চলছে। সংসারে একটু ভালো খাচ্ছি।’ মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা আয় করেন তিনি।
শিউলি বাসকীও আগে কোনো কাজ করতেন না। এখন সেলাইয়ের আয় দিয়ে সংসারে সহায়তার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনায় খরচ করতে পারছেন।
নারীদের কাজ দেওয়ার পর সুমি ভেবেছেন তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও। অনুমতি নিয়ে মিশনের জায়গায় পবার ভূগরইলে একটি ও সন্তোষপুরে একটি স্কুল চালু করেন। ভূগরইলের ‘শিশু প্রভাত বিদ্যানিকেতনে ৭২ শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক ও একজন আয়া রয়েছেন। সন্তোষপুরে রয়েছেন ৫৫ শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক ও একজন আয়া। দুটি স্কুলেই কোনো বেতন নেওয়া হয় না। বই, খাতা-কলমের ব্যবস্থা করেন বিনামূল্যে। আদিবাসী শিশুদের পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলমান পরিবারের শিশুরাও সেখানে পড়ছে।
দুটি স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয়ের বড় অংশ আসে নকশিকাঁথা বিক্রির মুনাফা থেকে। নিয়মিত বড় কোনো তহবিল বা অনুদান ছাড়াই চলছে এই দুটি স্কুল।
নারীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সবজির চারা, হাঁস-মুরগি ও ছাগলও দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ১০ নারীকে ১০টি ছাগল এবং ৫০ জনকে হাঁস-মুরগি পালনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
আদিবাসী নারীদের নিয়ে গড়ে তোলা ‘নারী ও শিশু কল্যাণ সংস্থা’র মাধ্যমেও চলছে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম। সদস্যরা পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, শিশুর নিরাপত্তা ও নির্যাতন প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করেন।
সুমি বললেন, ‘আমি যদি নারী আর শিশুদের জন্য কিছু করতে পারি, তাহলে মনে হয় তারা একটু হলেও ভালো থাকতে পারবে।’



