যুক্ত থাকা না থাকার কূটনীতি

সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না থাকলেও এখন ধরে নিতেই হয় যে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্য কোনো বিদেশ সফরে যাচ্ছেন না। ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া অধিবেশনে যোগ দিতে তার ২১ তারিখ যাওয়ার কথা এবং সম্ভবত ভাষণ দেবেন ২৪ তারিখ। ছয় মাস আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ পেয়েও জানা-অজানা নানা কারণে গড়িমসি এবং দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনে তিনি ভারতে দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরে গেলেন না। ভবিষ্যতে কখনো যাবেন। ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগদানের আমন্ত্রণও তিনি রক্ষা করছেন না। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে আমন্ত্রণটি এসেছিল গত ২৩ জুলাই।
ব্রিকস হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো, যা এখন গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণ বলে অভিহিত তার প্রধান উদীয়মান বাজারসমৃদ্ধ দেশগুলোর একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জোট। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন শুরু করলেও এখন দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি ১০টি দেশ পূর্ণ সদস্য এবং আরও ১৩টি অংশী দেশ আছে। বাংলাদেশসহ আরও কিছু দেশ সদস্য হতে চায়। ব্রিকসের প্রধান ভূমিকা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যমূলক বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রায়ণ বা সমসুযোগ বিস্তৃত করা। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অনেক দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা মোকাবিলা করা একটি লক্ষ্য। বিশ্বব্যাংকের একাধিপত্যের মুখোমুখি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ব্রিকস সদস্য না হয়েও বাংলাদেশ ওই ব্যাংকে যোগ দিয়েছে।
ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশন বা জনসংযোগমূলক সম্প্রসারিত অধিবেশনে যোগদানের জন্য বিমসটেক (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation, BIMSTEC) তথা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার চেয়ার বা প্রধান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিমসটেকের সদস্য হচ্ছে বাংলাদেশ, ভুটান, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।
তারেক রহমানের জন্য এটি ছিল একটি মহাসুযোগ। দিল্লি সামিটে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং, ইরানি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের মতো বড় নেতাদের আসার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় ও আলাপচারিতার সুযোগ হতো তারেকের। তা ছাড়া বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনেরও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি না গেলে মন্ত্রী বা কর্মকর্তা পর্যায়ের প্রতিনিধি কেউ যাবেন কি না, মাত্র চার দিন আগেও কোনো খবর নেই।
এই লেখা শেষ করার আগে সর্বশেষ খবর হলো, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। তিনি যথাসময়ে যাবেন। এ নিয়ে নতুন আলোচনার প্রয়োজন নেই।’
এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মিডিয়াকে বলেছেন, ‘ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী না এলে বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিনিধি আসবেন কি না, তা ভারত জানে না। জানানোর মতো নতুন তথ্য নেই।’
আর আমাদের তরফে সর্বশেষ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সেই ২২ আগস্ট জানিয়ে রেখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে তাড়াহুড়ার কিছু নেই। আলোচনায় অগ্রগতি হলে উপযুক্ত সময়ে তিনি সফরে যাবেন। তবে এতে আমাদের জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।’ উদ্ধৃতিগুলো সবই সংবাদপত্রে প্রকাশিত।
স্থান ভারত হলেও সম্মেলনটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের, যেখানে যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। আর বিযুক্ত থাকা ক্ষতিকর। কিন্তু তারেক রহমান যে যুক্ত হতে পারলেন না, তার পটভূমিতে রয়েছে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সৃষ্ট জটিলতা ও প্রবল এক টানাপড়েন। এর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে গিয়ে আশ্রিত থাকা।
স্থান ভারত হলেও সম্মেলনটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের, যেখানে যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। আর বিযুক্ত থাকা ক্ষতিকর
হাসিনার পর গঠিত প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করে দলটির ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালায়। একটি বিশেষ আদালত আন্দোলনকালে অনেক হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে প্রত্যর্পণ চায়। ভারত এক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলে বিলম্ব করতে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খারাপ হয়ে একেবারে তলায় গিয়ে ঠেকে। ইউনূস ভারতের পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য নিয়ে স্পর্শকাতর উক্তি করায় ভারত খুবই অসন্তুষ্ট হয়। তারা জানায়, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করবে। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক কারণে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের গভীর মৈত্রী থাকলেও নিকট অতীতে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের সময়ও ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিপুলভাবে জয়লাভ করায় তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত নানাভাবে অত্যন্ত আন্তরিক কূটনৈতিক বার্তা দেয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকায় এসে যোগদান, লোকসভায় শোকপ্রস্তাব গ্রহণ, নির্বাচিত হলে তারেক রহমানকে মোদির টেলিফোনে অভিনন্দন জানানো ও সপরিবারে সফরে যাওয়ার আমন্ত্রণ, ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে লোকসভার অধ্যক্ষ বা স্পিকার ওম বিড়লার যোগদান এবং মোদির নিমন্ত্রণপত্র হাতে নিয়ে আসা ইত্যাদি হচ্ছে কূটনৈতিক ইঙ্গিত বার্তা।
ভারতে দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার আমন্ত্রণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকার পরবর্তী পাঁচ মাসে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। মালয়েশিয়া ও চীন সফর করে আসেন তিনি। সফর নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ৫ আগস্ট নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয় দিল্লিতে শেখ হাসিনা একটি সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়াল বক্তব্য প্রদান ও প্রশ্নোত্তরে অংশ নিলে। শেখ হাসিনা সেখানে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে আইনি লড়াইয়ের জন্য ফিরে যাওয়ার পূর্ব ঘোষণা স্পষ্ট করেন এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও তার বিচার অবৈধ বলে দাবি করেন। বাংলাদেশ আগেই ভারত সরকারকে অনুরোধ করেছিল হাসিনাকে এই সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ না দিতে। ভারতের জবাব ছিল, এটি সরকারের আয়োজিত নয়, বিদেশি সাংবাদিকদের ক্লাবের আয়োজিত এবং হাসিনা যা বলেছেন তার সঙ্গে ভারত সরকার একমত নয়। এই জবাবে বাংলাদেশ সন্তুষ্ট তো হয়ইনি, কূটনৈতিক চ্যানেলে প্রতিবাদ না জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়ে তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানায়। সরকার শর্ত নির্ধারণ করে যে, কূটনৈতিক অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্ভব নয়। শর্ত হয়ে দাঁড়ায় শেখ হাসিনার দ্রুত প্রত্যর্পণ এবং ভারতে ধরা পড়া ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির খুনের আসামিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া। এভাবে শর্তারোপে কূটনৈতিক তথ্যাভিজ্ঞ মহলে বিস্ময় সৃষ্টি হয়। কারণ, ভারতের সঙ্গে যেখানে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর, সীমান্ত হত্যা, বিস্তৃত বাণিজ্য প্রভৃতি বহু ইস্যু আছে, সেখানে হাসিনার একক ইস্যুতে বাকি সব আলোচনার গতি বন্ধ রাখা কূটনৈতিক জগতে অজানা। বরং হাসিনা ইস্যুসহ সব ইস্যুতে আলোচনা চালানো ও বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে হাঁটাই সংগত। এ ধরনের একক ইস্যুতে হাত গুটিয়ে থাকার কৌশল আইসোলেশনিস্ট বা বিচ্ছিন্ন ও নন-এনগেজিং বা যুক্ত না থাকার কূটনীতি বলে পরিগণিত হবে।
লেখক: বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক






