ষড়যন্ত্রকারী কারা

‘এই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। দলের ভেতর থেকে হচ্ছে, দলের বাইরে থেকে হচ্ছে’— সম্প্রতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক আলোচনা সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এমন বক্তব্য রেখেছেন। প্রশ্ন হলো— এ উচ্চারণ শুধুই কি কথার কথা, নাকি এর পেছনে কোনো কারণ রয়েছে। কোনো রাখঢাক না রেখেই অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মির্জা আব্বাস কিন্তু এ কথা বলেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে এবং একদম তার পাশে বসেই। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে, তিনি বলেছেন— ‘এর মধ্যে অনেক কিছু হবে, হচ্ছে। সবকিছু আপনার কানে যায় না।’ অর্থাৎ বিএনপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অগোচরেও এমন কিছু তৎপরতা চলছে বলে দলের এই শীর্ষ নেতা মনে করছেন। আবার নিজের একটি লেখায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই; দৃশ্যমান না হলেও অদৃশ্য ষড়যন্ত্র চলমান।’ তার ভাষায়, সেই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই এখন লক্ষ্য।
দুই নেতার বক্তব্যের মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট— তারা ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কোনো ষড়যন্ত্রকারী বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নাম বলেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ষড়যন্ত্রকারী কারা?
১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার, দমনপীড়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির বড় বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই ক্ষমতায় আসা দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়েরই ফসল। ফলে ক্ষমতায় আসার পর দলের সামনে যেমন বিপুল প্রত্যাশা, তেমনি রয়েছে অনেক ঝুঁকি। মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ— ‘দলের ভেতর থেকে’। এর অর্থ কি বিএনপির ভেতরেই কোনো ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে? নাকি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বড় দলের ভেতরে সুযোগসন্ধানী কোনো অংশ সক্রিয় হয়েছে?
আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ— ‘দলের বাইরে’ কারা? এখানে সম্ভাব্য কয়েকটি রাজনৈতিক স্তর রয়েছে। প্রথমত, বিএনপির সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক। তৃতীয়ত, বিএনপির ক্ষমতায় আসায় যেসব স্বার্থগোষ্ঠীর রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হিসাব বদলে গেছে, তারাও কোনোভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। চতুর্থত, রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা বিভিন্ন স্বার্থকেন্দ্র। আর পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থও বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনার কোনোটি থেকেই প্রমাণ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্রকে ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটির একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। প্রায় প্রতিটি সরকারই কোনো না কোনো সময়ে দাবি করেছে, সরকারের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে। আবার রাজনৈতিক বিরোধীরাও পাল্টা দাবি করেছে, ‘ষড়যন্ত্রের গল্প’ তুলে সরকার মূল সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে চাইছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটির একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। প্রায় প্রতিটি সরকারই কোনো না কোনো সময়ে দাবি করেছে সরকারের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের প্রসঙ্গ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগ করে শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির নির্বাচনী বিজয়ের পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক ও অভিন্ন উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত বিষয় শেখ হাসিনা। ঢাকা তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা আইনি কাঠামোর মধ্যে পর্যালোচনা করছে। একই সময়ে শেখ হাসিনার ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়াও ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও জটিল হয়ে উঠেছে। আগস্টে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। ভারত সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ইস্যু জড়িয়ে গেছে। এখানে ষড়যন্ত্রের অভিযোগের সঙ্গে ভারতের নাম জুড়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু সেটি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও প্রমাণ ছাড়া দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ হবে না। বরং বাস্তবতা হলো— ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে স্বার্থের পার্থক্য আছে, শেখ হাসিনা দুই দেশের সম্পর্কের একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে আছেন এবং এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এটুকু বলার মতো যথেষ্ট তথ্য রয়েছে।
বিএনপির একসময়কার বন্ধু কর্নেল অলি আহমদের বক্তব্যটিও প্রাসঙ্গিক। জুলাইয়ে তিনি তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে দাবি করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ‘চারদিক থেকে মারাত্মক শত্রু দ্বারা বেষ্টিত’ এবং সরকার ও দলের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিদেশি গুপ্তচর থাকতে পারে— এমন আশঙ্কার কথাও বলেছিলেন। তিনি তারেক রহমানকে ঢাকার বাইরে রাতে না থাকার পরামর্শ দেন। অলির বক্তব্য নিঃসন্দেহে মির্জা আব্বাসের বক্তব্যের চেয়ে আরও তীব্র।
একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক-মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা যখন একজন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে এমন সতর্কতা উচ্চারণ করেন, তখন সেটিকে একেবারে উপেক্ষাও করা যায় না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর উচিত এমন আশঙ্কা থাকলে তা যাচাই করা। আর রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত জনসমক্ষে আতঙ্ক না ছড়িয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মির্জা আব্বাস নিজেই বলেছেন, ‘সবকিছু আপনার কানে যায় না।’ এ কথাটিই সবচেয়ে বেশি ভাবার মতো। একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে তথ্য পৌঁছানোর পথ যত বেশি স্তরযুক্ত হয়, ভুল তথ্যের সম্ভাবনাও তত বাড়ে। আর ভুল তথ্যের ওপর নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই অনেক সময় একটি সরকারের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনে।
তারেক রহমানের সরকার এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন জনগণ অতীতের রাজনৈতিক সংঘাত নয়, ফলাফল দেখতে চায়। সুতরাং ‘ষড়যন্ত্র হচ্ছে’— এ সতর্কবার্তা যদি সত্য হয়, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তার উৎস শনাক্ত করা।
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়





