শির দিল্লি সফরে কূটনৈতিক বরফ গললেও ব্যবসায়িক সম্পর্কে অবিশ্বাস কি ভাঙবে

২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সাক্ষাৎ করেন- রয়টার্স
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ সপ্তাহে নয়াদিল্লি সফর করবেন। তার এই সফর দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উষ্ণতা আরও বাড়াতে পারে। সাত বছর পর ভারতে তার এই প্রথম সফর। তবে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কও যে উন্নত হবে, এমন লক্ষণ এখনও খুব বেশি নেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও নানা বাধার মুখে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিধিনিষেধের কারণে বিনিয়োগ আটকে থাকা, ভিসা পেতে দেরি এবং শিল্প সরঞ্জাম আমদানিতে বিধিনিষেধ। এসব বিষয় দুই দেশের কূটনৈতিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে বড় ব্যবধানটি তুলে ধরছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, বার্ষিক ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে এই সপ্তাহান্তে নয়াদিল্লিতে আসছেন শি। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে কি না, তা এখনও জানা যায়নি। দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে, তা নির্ধারণে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
১৯৬২ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ হয়েছিল। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সতর্কতা ছিল। ২০২০ সালে সীমান্তে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় ও চারজন চীনা সেনা নিহত হওয়ার পর সেই সম্পর্ক আরও খারাপ হয়।
চীন অবশ্যই সম্পর্কের উন্নতি চায়। তবে ভারত আসলে কতটা সম্পর্ক উন্নত করতে চায়, আমরা সেটিই দেখার অপেক্ষায় আছি।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে গত বছর মোদির চীন সফরের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দেশেরই টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে এই উন্নতি দেখা গেছে।
সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও নয়াদিল্লিতে চীনা দূতাবাসের সাবেক কূটনীতিক লিন মিনওয়াং বললেন, ‘চীন অবশ্যই সম্পর্কের উন্নতি চায়। তবে ভারত আসলে কতটা সম্পর্ক উন্নত করতে চায়, আমরা সেটিই দেখার অপেক্ষায় আছি।’ তার মতে, বড় ধরনের অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
নয়াদিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হার্শ পান্ত বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে ‘আস্থার ঘাটতি’ অনেক বেশি।
তিনি বললেন, ‘চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বেশি। সেই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার ভালো সুযোগ চীনের সামনে রয়েছে, বিশেষ করে যখন দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির প্রভাবের মুখে পড়ছে।’
মার্চে ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর চীনা বিনিয়োগের ওপর আরোপ করা কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করে ভারত। ইলেকট্রনিকস, মূলধনী পণ্য ও সোলার সেল খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই শিথিলতা আনা হয়। কিছু শিল্পে ভারতীয় ও চীনা কোম্পানির যৌথ উদ্যোগ দ্রুত অনুমোদনের বিষয়টিও বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি।
এরপর নয়াদিল্লি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ভারতের ডিক্সন টেকনোলজিস ও চীনের স্মার্টফোন নির্মাতা ভিভো মোবাইলের একটি যৌথ উৎপাদন উদ্যোগ রয়েছে।
তবে ভারত সরকারের একটি সূত্রের মতে, এতেও বিওয়াইডি ও গ্রেট ওয়াল মোটরের মতো বড় চীনা কোম্পানিগুলোকে ভারতে ফিরিয়ে আনা যায়নি। নয়াদিল্লির বাড়তি নজরদারির মুখে এসব কোম্পানি ভারতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা স্থগিত করেছিল।
গ্রেট ওয়াল মোটর ও বিওয়াইডি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’
চীনা কোম্পানিগুলো ভারতে বিনিয়োগের যে প্রস্তাব দিচ্ছে, সেগুলো এখন বেইজিংয়ের দিক থেকেও আরও বেশি যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে যেখানে উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা ও উচ্চপ্রযুক্তির বিষয় জড়িত, সেসব খাতে এই নজরদারি বেশি বলে সূত্র ও আরেকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানিয়েছেন। তারা পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন, কারণ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি তাদের নেই।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, চলতি মাসে কিরগিজস্তানে একটি আঞ্চলিক ফোরামে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করা শি ও মোদি মনে করেন, দুই দেশ ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার এবং একে অপরের উন্নয়নের জন্য হুমকি নয়, বরং সুযোগ’।
ভারতের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চীনের অ্যান্ট গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম আলিপের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেনি নয়াদিল্লি। প্রস্তাবটিতে আলিপেকে ভারতের তাৎক্ষণিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা ইউপিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ছিল।
ভারত সরকার চীনা মোবাইল ফোন নির্মাতা শাওমির বিরুদ্ধে তদন্তের সুপারিশও বিবেচনা করছে। ভারতে ব্যবসায় অনিয়ম এবং বিদেশি বিনিয়োগ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশটির সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিস বা এসএফআইও এই সুপারিশ করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। শাওমি বলেছে, তারা ভারতের সব স্থানীয় আইন মেনে চলে এবং এসএফআইওর কাছ থেকে কোনো যোগাযোগ পায়নি।
অবশ্যই, দুই দেশের নাগরিকদের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থই শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়। তবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ তৈরি করতে পারে।
একই সময়ে ভারতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, চীনা কর্তৃপক্ষ দেশটির কোম্পানিগুলোকে ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সরঞ্জাম বিক্রি না করতে বলেছে। এর মধ্যে বন্দর সরঞ্জাম, সোলার প্যানেল ও মোবাইল ফোন তৈরির সরঞ্জাম রয়েছে। এ বিষয়ে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
গত বছর ভারত ও চীন সরাসরি বিমান চলাচল আবার চালু করে। চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করে নয়াদিল্লি।
তবে চীনে ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে, এমন কয়েকজন ভারতীয় ব্যবসায়ী সম্প্রতি ভিসা পেতে সমস্যায় পড়েছেন বলে একটি সূত্র ও শিল্প খাতের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘যেসব ভারতীয় নাগরিকদের চীনে যাওয়ার প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে’ আইন ও বিধি অনুযায়ী ভিসা দেওয়া হয়।
শিল্প খাতের ওই কর্মকর্তা ও দুই ভারতীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সোলার এনার্জি, ইলেকট্রনিকস ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভারতের প্রয়োজনীয় চীনা তৈরি সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশও এ বছর চীনের কাস্টমসে আটকে দেওয়া হয়েছে।
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চীন থেকে আনা কয়েকটি বিশাল টানেল খননকারী যন্ত্র এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে আছে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় সরকারের এক কর্মকর্তা।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা এবং ভারতের সাবেক বাণিজ্য আলোচক অজয় শ্রীবাস্তব বলেছেন, ভিসা ও সরঞ্জাম আটকে রাখার ঘটনা ‘শুধু প্রশাসনিক জটিলতার’ বিষয় নয়। এটি দেখায়, ভারতের বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারে চীনের আগ্রহ রয়েছে।
তবে মোদি ও শির বৈঠক ভালোভাবে হলে কিছু বাধা দূর করতে সহায়তা করতে পারে।
ভারতের সাবেক শীর্ষ বাণিজ্য কর্মকর্তা অনুপ ওয়াধওয়ান বলেছেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের যেকোনো বৈঠকই ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরও ভালোভাবে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি করে’।
তিনি বললেন, ‘অবশ্যই, দুই দেশের নাগরিকদের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থই শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়। তবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ তৈরি করতে পারে।’







