গাজীপুরে স্বপ্নের আশ্রয়ণের ঘরে ঝুলছে তালা
- পাঁচ উপজেলায় জমিসহ সেমিপাকা ঘর পেয়েছে ১,৮১৭ পরিবার

রঙিন টিনের ছাউনি, সেমিপাকা ঘর, সামনে খোলা উঠান। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সাজানো একটি আবাসিক এলাকা। কিন্তু গাজীপুরের কয়েকটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। অনেক ঘরের দরজায় ঝুলছে তালা। কোথাও আগাছায় ঢেকে গেছে উঠান, কোথাও বারান্দায় রাখা হয়েছে লাকড়ি বা গৃহপালিত পশু। বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেক পরিবার সেখানে থাকছে না।
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের স্থায়ী আবাসনের জন্য এসব ঘর নির্মাণ করা হলেও বসবাস না করার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। বাসিন্দাদের ভাষ্য, কর্মসংস্থানের সুযোগ কম, যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে অনেকে প্রকল্প ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, জেলার পাঁচ উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ‘ক’ শ্রেণির ১ হাজার ৮১৭টি ভূমি ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ সেমিপাকা ঘর দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে গাজীপুর সদরে ৬৩০টি, শ্রীপুরে ২৮০, কাপাসিয়ায় ৩১৮, কালিয়াকৈরে ৪৪০ এবং কালীগঞ্জে ১৪৯টি ঘর রয়েছে। প্রতিটি ঘরে দুটি শোয়ার ঘর, রান্নাঘর, শৌচাগার ও বারান্দা রয়েছে। প্রকল্পভেদে বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি, খেলার মাঠ, মসজিদ ও কাছাকাছি বিদ্যালয়ের সুবিধাও রাখা হয়েছে। এত সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও কিছু ঘর খালি পড়ে আছে।
গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী, মির্জাপুর ও বাড়িয়া ইউনিয়নের কয়েকটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কিছু এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘর ফাঁকা পড়ে আছে। কোনো কোনো বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজে না থেকে ঘর ভাড়া দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার কেউ কেউ শুধু দখল বজায় রাখতে মাঝেমধ্যে প্রকল্পে আসেন।
ঘর ফাঁকা পড়ে থাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যাও। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন মানুষ না থাকায় অনেক ঘরের চারপাশে ঝোপঝাড় জন্মেছে। কোথাও ঘরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, কোথাও ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। খালি ঘরগুলোয় রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে— অভিযোগ স্থানীয় কয়েকজনের। এতে প্রকল্পের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পিরুজালী এলাকার বাসিন্দা তাইজুল ইসলামের ভাষ্য, প্রকল্পে কাজের সুযোগ কম থা কায় অনেক পরিবার শুরুতে ঘরে উঠলেও পরে চলে গেছেন। শিশুদের পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা না থাকায় অনেকে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকতে আগ্রহী নন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা বলছেন, ফাঁকা ঘরগুলোয় নিয়মিত তদারকি না থাকায় নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের জন্য খালি ঘরগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
তাদের ভাষ্য, সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়াই উপকারভোগী নির্ধারণ করায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিগত সময়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বহিরাগতদের মধ্যে ঘর ও জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব বাড়ি থাকায় অনেকে এসব ঘরে বসবাস করছেন না।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আবুর হোসেনের মতে, প্রকল্পে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য তদারকি বাড়ানো, অনিয়ম তদন্ত ও ফাঁকা ঘরগুলো প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে পুনর্বণ্টন করা জরুরি। না হলে ব্যাহত হবে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
যদিও প্রকল্প এলাকায় নাগরিক সুবিধা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া। যারা বরাদ্দ পাওয়ার পরও স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন না, তাদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
‘খালি থাকা ঘরগুলোয় নতুন করে মানুষ বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় নাগরিক সুবিধা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়া হবে’— বলেছেন এই কর্মকর্তা।



