নিখোঁজের ২৪ বছর
পাকিস্তানিকে বিয়ে করে নিখোঁজ বাংলাদেশি নারী, সন্ধানে হাইকমিশন
- অপরাধের শিকার হয়েছেন নীলা, আশঙ্কা পরিবারের
- স্বামীর করাচির ঠিকানায় গিয়ে মেলেনি খোঁজ

নারগিস সুলতানা নীলা ২০০০ সালে পাকিস্তানি নাগরিক মেহবুব হোসেন খান বাবুকে বিয়ে করে পাকিস্তানে যান।
নারগিস সুলতানা নীলা। বেড়ে উঠেন ঢাকায়। পারিবারিকভাবে পাকিস্তানি যুবকের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ২০০০ সালে। স্বামীর সঙ্গে পাড়িও জমান করাচিতে। প্রথম দুই বছর ভালোই যোগাযোগ ছিল পরিবারের সঙ্গে। এরপর হঠাৎ করেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে নানা চেষ্টা করেও নীলার কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। গত ২২ আগস্ট ‘বঙ্গ ভিটা’ ফেসবুক পেজে নারগিস সুলতানা নীলাকে খুঁজে পাওয়ার আবেদন জানিয়ে একটি পোস্ট প্রকাশ করা হয়। পোস্টটি নজরে আসে ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের। তার সন্ধানে কাজ করার আশ্বাসও দিল তারা।
বঙ্গ ভিটার অ্যাডমিন সাইফুল ইসলাম বললেন, ‘বঙ্গ ভিটা পেজে নীলার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বিস্তারিত জানান। এরপর আমি তাদের পক্ষ থেকে পেজে একটি পোস্ট দেই। পরবর্তীতে ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এই বিষয়ে বিশদ তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।’
ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলর (প্রেস) তায়েব আলী ‘বঙ্গ ভিটা’র পেজ অ্যাডমিন সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নীলার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
যোগাযোগ করা হলে আগামীর সময়কে তায়েব আলী বলেছেন, ‘বঙ্গ ভিটার পোস্টটি নজরে আসার পর আমরা এ বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেই। পেজের অ্যাডমিন ও নীলার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা বেশ কিছু ডকুমেন্টস পেয়েছি। তবে তদন্তের জন্য এটা খুবই সামান্য। তবুও আমরা এসবের সূত্র ধরেই খোঁজ চালাব। হাইকমিশনার স্যার এখন পাকিস্তানের বাইরে আছেন, ফিরলেই এ বিষয়ে কাজ শুরু হবে।’
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারগিস সুলতানা নীলা ২০০০ সালের ২০ মার্চ পাকিস্তানি নাগরিক মেহবুব হোসেন খান বাবুকে বিয়ে করে পাকিস্তানে যান। মেহবুবের সঙ্গে নীলার পরিবারের পরিচয় হয়েছিল তার বড় বোনের স্বামীর ব্যবসার সূত্রে। নীলাকে বিয়ের পর পাকিস্তানে নিয়ে যান মেহবুব।
পরিবারের দাবি, পাকিস্তানে যাওয়ার পর কিছুদিন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। ২০০২ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত নীলার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এরপর হঠাৎ তার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মাঝে একবার যোগাযোগ স্থাপন হলেও তাদের জানানো হয় মেহবুবের স্ত্রী মারা গেছেন এবং ফের যোগাযোগ করতে নিষেধ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ তাহির এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছে। তিনি বললেন, ‘যতটুকু খোঁজ পেয়েছি, মেহবুবের দুজন স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী জেবা, যিনি মারা গেছেন। তবে নীলাকে বিয়ে করার সময় এ কথা গোপন রেখেছিলেন তিনি।’
নিখোঁজ সন্তানদের অপেক্ষায় স্বজনদের কান্না, উদ্ধারে নতুন ইউনিট গঠনের দাবি
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পরিবারের কাছে পাকিস্তানে নীলার শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল করাচির কোরাঙ্গি ডাই নম্বর গলি—‘আড়াই নম্বর গলি’। তার স্বামীর বাবার নাম ছিল খলিলুল্লাহ। মেহবুবের এক ভাইয়ের নাম আবিদ এবং এক বোনের নাম নান গুড়িয়া বলে পরিবার জানিয়েছে।
তাহির বলছিলেন, ‘মেহবুবের ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তারা আর সেখানে থাকেন না। সম্ভবত লাহোরে চলে গেছেন।’
পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, নীলা হয়তো কোনো অপরাধের শিকার হয়েছেন, আবার তিনি পাকিস্তানেই সংসার করছেন কি না, সেটিও তারা জানেন না। দীর্ঘদিন ধরে কোনো যোগাযোগ না থাকায় তার পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
অপরাধের আশঙ্কা করে সাইফুল বললেন, ‘বিভিন্নভাবে পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়া বাংলাদেশিদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে বহু বাংলাদেশি নারী পাচার হয়েছেন। তারা বিভিন্নভাবে অপরাধের শিকার হয়েছেন। নীলার ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে কি না এটা খুঁজে বের করা জরুরি।
সাইফুলের মতে, ‘বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অধিকাংশ সময় এসব পাচার বা এ ধরনের ব্যাপারে বিস্তারিত তলিয়ে দেখা হয় না। যার ফলে বহু নারী নিখোঁজই থেকে যান। আমি আশা করব এসব বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দেবে।’
‘বঙ্গ ভিটা’র ওই পোস্টে নীলার পরিবারের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের মানুষের কাছেও তার সন্ধান পেতে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশনের নজরে আসে।
নীলার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাদের বাবা নুর নবী মেয়ের দুশ্চিন্তায় মারা যান। বর্তমানে তাদের মা নুর জাহান বেগমও গুরুতর অসুস্থ বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নীলার ভাই নাফিউল হুদা ও তার পরিবারের ভাষ্য, এত বছর ধরে তারা নীলার কোনো খবর পাননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর এবার বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস পাওয়ায় পরিবারটি নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছে।




