বয়স্কদের যত্নে ইসলামের শিক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় যে হাতটি সন্তানকে আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছে, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই হাতটিই হয়তো কাঁপতে থাকে। যে কোমল কণ্ঠ একদিন সন্তানের ঘুম ভাঙিয়েছে, বয়সের ভারে সেই কণ্ঠে জড়তা নামে। যে মা-বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের বর্তমান বিসর্জন দিয়েছেন, বার্ধক্যে এসে তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটু সময়, একটু মনোযোগ এবং আপনজনের পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য এক শহর থেকে অন্য শহরে কিংবা বিদেশে চলে যাওয়া এবং যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবারের দিকে ঝুঁকছে। সব মিলিয়ে পরিবারগুলোতে প্রবীণদের অবস্থানেও পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ও অনুপাত ক্রমে বাড়ছে। ফলে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রবীণদের বিষয়টি শুধু পারিবারিক আবেগের জায়গায় না রেখে তাদের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজানো সময়ের প্রয়োজন।
ইসলাম বহু আগেই পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের মর্যাদা ও অধিকারের একটি সুস্পষ্ট নৈতিক কাঠামো ঘোষণা করে রেখেছে। পিতা-মাতার বিষয়ে কোরআনের নির্দেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে।’ এরপর বলা হয়েছে, ‘তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের উফ্ বলো না, তাদের ধমক দিয়ো না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৩)
এখানে পবিত্র কোরআন শুধু পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে বলেনি; বিশেষভাবে তাদের বার্ধক্যের সময়টিকে উল্লেখ করেছে। কারণ, বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের শারীরিক নির্ভরশীলতা যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়তে পারে মানসিক সংবেদনশীলতাও। ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার সঙ্গে বিরক্তির স্বরে কথা বলা, তাদের সিদ্ধান্তকে তুচ্ছ করা, বারবার তাদের ‘ঝামেলা’ মনে করা কিংবা তাদের প্রয়োজনকে অপ্রয়োজনীয় বলে এড়িয়ে যাওয়া ইসলামের কাঙ্ক্ষিত পারিবারিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পবিত্র কোরআন আরও একটি অসাধারণ দোয়া আমাদের শিখিয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছেন।’ (সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৪) এখানে সন্তানের স্মৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে তার নিজের অসহায় শৈশবকে। তখন সন্তান ছিল নির্ভরশীল; আজ পিতা-মাতা বার্ধক্যে এসে অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল। জীবনের এই বিনিময়টিই পারিবারিক দায়িত্বের গভীরতম শিক্ষা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি জানতে চেয়েছিলেন, তার উত্তম সাহচর্যের সবচেয়ে বেশি অধিকারী কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ ব্যক্তি আবার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ তৃতীয়বারও বললেন, ‘তোমার মা।’ এরপর বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৭১) মায়ের প্রতি বিশেষ মর্যাদা প্রদানের পাশাপাশি এই হাদিস পরিবারে দায়িত্বের গভীরতাও নির্দেশ করে।
তবে বয়স্ক মানুষের দায়িত্ব শুধু পিতা-মাতাকে ঘিরে নয়; দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-মামা, খালা-ফুফু কিংবা পরিবারের অন্য প্রবীণ সদস্যরাও ভালোবাসা, সম্মান ও সহযোগিতার অধিকারী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪৩)
আসুন, আমরা এমন এক পারিবারিক মূল্যবোধ গড়ে তুলি, যেখানে মা-বাবা ও বয়োবৃদ্ধদের যত্ন ও সম্মান দেওয়াটাই স্বাভাবিক নিয়ম হবে
এই নির্দেশনার আলোকে বয়স্কদের প্রতি দায়িত্বকে শুধু অর্থনৈতিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ করা যথেষ্ট নয়। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে দেওয়া, নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করা অবশ্যই দায়িত্বের অংশ। কিন্তু এর পাশাপাশি তাদের কথা মন দিয়ে শোনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্মান দেওয়া, একাকিত্ব দূর করতে সময় দেওয়া এবং তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া সমভাবে জরুরি। অনেক পরিবারে প্রবীণ ব্যক্তি একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে একা। সন্তান নিজের মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, নাতি-নাতনিরা থাকে নিজেদের জগতে। অথচ পাশের ঘরেই বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটি দিনের পর দিন কারও সঙ্গে মন খুলে একটু কথা বলার অপেক্ষায় আছেন।
বিশেষত প্রবাসীদের মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে বেশি সাবধানতা আবশ্যক। শুধু টাকা দেওয়া নয়; বরং নিয়মিত ফোন বা ভিডিওকলে কথা বলা, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ব্যবস্থা করা, জরুরি সময়ে বিশ্বস্ত আত্মীয় বা প্রতিবেশীর সহায়তা নিশ্চিত করার মতো কাজগুলো দায়িত্ব পালনের অংশ।
এখানে আরেকটি ভারসাম্যের বিষয়ও মনে রাখা জরুরি। ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু অন্যায় বা আল্লাহর অবাধ্যতায় অন্ধ আনুগত্যের নির্দেশ দেয়নি। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা যদি শিরকের দিকে চাপ প্রয়োগও করেন, তুমি তাদের আনুগত্য করবে না; তবে দুনিয়াতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৫) অর্থাৎ মতভেদ থাকলেও সম্পর্কের সৌজন্য ও মানবিকতা নষ্ট করা যাবে না।
বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে তাই বয়স্কদের যত্নকে ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও ভাবতে হবে। পরিবারে ছোটদের শেখাতে হবে যে বৃদ্ধ মানুষ বোঝা নন; তারা পরিবারের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও উত্তরাধিকারের ধারক। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো শুধু তাদের প্রয়োজন পূরণ নয়, নতুন প্রজন্মের জন্য তা আবশ্যিক দায়িত্ব।
সময়ের পরিক্রমায় বার্ধক্য সবার জীবনেই আসতে পারে। আজ যে সন্তান ব্যস্ততার অজুহাতে বৃদ্ধ বাবার ফোনটি ধরছে না, কাল হয়তো তাকেও কারও একটি ফোনের অপেক্ষায় থাকতে হবে। তাই আসুন, আমরা এমন এক পারিবারিক মূল্যবোধ গড়ে তুলি, যেখানে মা-বাবা ও বয়োবৃদ্ধদের যত্ন ও সম্মান দেওয়াটাই স্বাভাবিক নিয়ম হবে। আজ প্রবীণদের প্রতি আমাদের দায়িত্বশীল আচরণ মূলত ভবিষ্যতে নিজেদের জন্যই এক সুরক্ষা ও মমতার ভিত্তি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



