সম্পাদকীয়
রূপপুর সতর্কতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। তবে এই উচ্চপ্রযুক্তির কেন্দ্রটি পরিচালনার ক্ষেত্রে চরম ঝুঁকিও বিদ্যমান। এ কারণে প্রকল্পটি নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে যেমন বড় প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি গভীর নিরাপত্তা শঙ্কাও প্রকাশ পাচ্ছে।
বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি কালচার বা শিল্প নিরাপত্তা সংস্কৃতির যে দৈন্যদশা প্রতিনিয়ত দেখা যায়, তাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর ব্যবস্থা পরিচালনা করা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা হয়তো সাধারণ অনেকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন না। রূপপুর প্রকল্পের পাইওনিয়ার বেজে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড সেই ভয়কেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল নকশায় সর্বোচ্চ সতর্কতার কথা বলা হলেও সেফটি কালচারের ব্যাপক ঘাটতির কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই প্রকল্পের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আসলে কেমন ছিল, তা এখন বড় প্রশ্নের মুখোমুখি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) রূপপুর কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা নিয়ে স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। সংস্থাটি ফায়ার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ করে। দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি অত্যাধুনিক ফায়ার স্টেশনে অন্তত ২০০ জনের বেশি দক্ষ জনবল থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও রূপপুরে তা গড়ে তোলা হয়নি। বর্তমানে মাত্র ৪৯ জন কর্মী নিয়ে সাধারণ মানের একটি ফায়ার স্টেশন দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা একটি পারমাণবিক স্থাপনার জন্য মোটেও নিরাপদ নয়।
তবে মূল অগ্নিকাণ্ডের চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের গোপনীয়তা অবলম্বন এবং রাখঢাক করার মনোভাব। সোমবার ভোরের আগুন লাগার ঘটনা গণমাধ্যম জানতে পেরেছে মঙ্গলবারে এসে। আগুন ছোট বা বড় যাই হোক না কেন, পারমাণবিক স্থাপনায় এমন তথ্য চেপে রাখার প্রবণতা কোনো ভালো বার্তা দেয় না। অগ্নিকাণ্ডের তথ্য যদি দুই দিন পর প্রকাশিত হয়, তবে কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হওয়ার পর কোনো তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনা ঘটলে দেশবাসী আদৌ তা সময়মতো জানতে পারবে কি না— সে বিষয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক।
তবে বাস্তবতার আলোকে যদি বিচার করা হয়, একদিকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে রূপপুরের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্পষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে; অন্যদিকে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে এর বিপক্ষেও অনেক যুক্তিসংগত মত রয়েছে। এমন এক টানাপড়েন এবং স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে যখন প্রথম বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকেই এখনো বিদ্যুৎ পাওয়া শুরু হয়নি, তখন দেশে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের। এ ধরনের বৃহৎ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বিষয়টি আমাদের আরও অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা উচিত।
পারমাণবিক শক্তিতে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। পারমাণবিক স্থাপনায় ছোট বা বড়— যেকোনো ঘটনাই বড় বিপর্যয়ের সংকেত। রূপপুরের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এখন সময়ের দাবি। তথ্য গোপন না করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আর নতুন কোনো পারমাণবিক প্রকল্পের পরিকল্পনা করার আগে রূপপুরের প্রতিটি নিরাপত্তা স্তর শতভাগ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। জননিরাপত্তা ও দেশীয় স্বার্থের প্রশ্নে সামান্যতম শিথিলতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।



