৯/১১ হামলার ২৫ বছর পর আল-কায়েদা এখন কতটা শক্তিশালী?

ছবি: রয়টার্স
যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে হামলা চালায় আল-কায়েদার জঙ্গিরা। এর ২৫ বছর পরও বিভিন্ন দেশে ডালপালা বিস্তার করেছে ওসামা বিন লাদেনের প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি।
২০১১ সালে মার্কিন বাহিনীর হাতে বিন লাদেনের নিহত হওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেটের উত্থানসহ বিভিন্ন ধাক্কা খেলেও এখনো অনেক অঞ্চলে জঙ্গিবাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি।
আল-কায়েদা কী?
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে একটি আন্তঃদেশীয় জিহাদি নেটওয়ার্ক হিসেবে আল-কায়েদার উত্থান ঘটে। বিন লাদেনের জন্ম সৌদি আরবের একটি ধনী পরিবারে। ১৯৭৯ সালের পর আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা আরব যোদ্ধাদের নিয়োগ ও তাদের সহায়তা পৌঁছে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ওই যুদ্ধে নিজেও অংশ নিয়েছিলেন বিন লাদেন।
কট্টরপন্থী ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও অঞ্চলটির তাদের মিত্র সরকারগুলোর প্রতি বৈরিতার কারণে আল-কায়েদা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে জঙ্গিদের কাছে। ১৯৯৪ সালে সৌদি নাগরিকত্ব বাতিল এবং ১৯৯৬ সালে সুদান থেকে বহিষ্কার করা হলে বিন লাদেন আফগানিস্তানে আশ্রয় নেন।
আফগানিস্তানে যাওয়ার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা শুরু করেন বিন লাদেন। ১৯৯২ সালে ইয়েমেনে দুটি হোটেলে বোমা হামলা চালায় আল-কায়েদা। সোমালিয়াগামী মার্কিন সেনাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। তবে হামলার সময় মার্কিন সেনারা সেখানে ছিল না।
আফগানিস্তানে বিন লাদেন প্রশিক্ষণ শিবিরে সহায়তা করেন এবং বিদেশি যোদ্ধাদের একটি বিশেষ ব্রিগেড গড়ে তোলেন। ১৯৯৬ সালে সৌদি আরব দখল করে রাখা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় সংগঠনটি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলা চালায় তারা। হামলাকারীদের ১৫ জনই ছিলেন সৌদি আরবের নাগরিক।
হামলার জন্য চারটি বিমান ছিনতাই করা হয়। এর মধ্যে চতুর্থ বিমানটির যাত্রীরা ককপিটে ঢুকে পড়ার পর পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। ওই হামলায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত হন।
৯/১১-এর পর আল-কায়েদার নেতাদের কী হয়েছিল?
টুইন টাওয়ারে হামলার পরের মাসেই আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। নিজের ঘাঁটি থেকে বিতাড়িত হয় আল-কায়দা।
২০০১ সালের ডিসেম্বরে তালেবানবিরোধী বাহিনী তোরা বোরা পাহাড়ে আল-কায়েদার ঘাঁটি দখল করে নেয়। তবে পরবর্তী এক দশক আত্মগোপনে ছিলেন বিন লাদেন। এই সময়ে মাঝেমধ্যে বার্তা প্রকাশ করতেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে একটি বাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে নিহত হন তিনি।
৯/১১-এর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত খালিদ শেখ মোহাম্মদকে ২০০৩ সালে পাকিস্তানে আটক করা হয়। ২০০৭ সালে মোহাম্মদ বলেছিলেন, তিনি ‘এ টু জেড’ অর্থাৎ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন।
কিউবার গুয়ানতানামো বে-তে আটক মোহাম্মদ ও তার তিন সহযোগীকে ২০২৮ সালের জুনে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন বিচারক।
বিন লাদেনের উত্তরসূরি আয়মান আল-জাওয়াহিরি ২০২২ সালে কাবুলে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। মিসরীয় সেইফ আল-আদেলকে বর্তমানে আল-কায়েদার নেতা বলে মনে করা হয়।
৯/১১-এর পর কীভাবে আল-কায়েদার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে?
৯/১১-এর পর আল-কায়েদার নেতারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত বা এর আদর্শে অনুপ্রাণিত জঙ্গিরা অসংখ্য হামলা চালিয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০০২ সালে বালির একটি নাইটক্লাব এলাকায় হামলা। এতে ২০২ জন নিহত হন। ২০০৪ সালে মাদ্রিদে ট্রেনে বোমা হামলায় ১৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। ২০০৫ সালে লন্ডনের পাতালরেল ট্রেন ও একটি বাসে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন ৫২ জন।
মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরেও আল-কায়েদার বিভিন্ন শাখা গড়ে ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী শাখাটি ছিল ইরাকে। ২০০৩ সাল দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো আগ্রাসনের পর আল-কায়েদা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে।
২০০৭ সালে উত্তর আফ্রিকায় এবং ২০০৯ সালে আরব উপদ্বীপে আল-কায়েদার শাখা গড়ে ওঠে। ২০১১ সালের পর সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আল-কায়েদার নুসরা ফ্রন্ট একটি শক্তিশালী পক্ষ হয়ে ওঠে।
আফ্রিকায় আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে সোমালিয়ার আল-শাবাব এবং সাহেল অঞ্চলের জামাআত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন (জেএনআইএম)। ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়া তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গেও আল-কায়েদার সম্পর্ক রয়েছে।
লন্ডনের আরইউএসআই থিংকট্যাংকের জ্যেষ্ঠ গবেষক আন্তোনিও জিউস্তোজ্জি বলেছেন, আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের পর আল-কায়েদা ক্ষয়ক্ষতি ও ছত্রভঙ্গের মুখে পড়লেও পরবর্তী বছরগুলোতে পরিচিতি বেড়েছে সংগঠনটির।
তিনি জানান, ২০১৩ সালের দিকে আল-কায়েদার প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এরপর সংগঠনটির ইরাকি শাখা বেরিয়ে গিয়ে ইসলামিক স্টেট গঠন করে।
ইসলামিক স্টেটের উত্থানে আল-কায়েদা কীভাবে প্রভাবিত হয়?
ইসলামিক স্টেটের প্রতিষ্ঠাতা আবু বকর আল-বাগদাদি আল-কায়েদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ২০১৪ সালে সিরিয়া ও ইরাকার বড় অংশজুড়ে ‘খেলাফত’ ঘোষণা করেন। এর ফলে সেখানে থাকা নুসরা ফ্রন্টের সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়।
এক পর্যায়ে সিরিয়া ও ইরাকে নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হয় ইসলামিক স্টেট। আল-কায়েদার সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো চলছে। বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকায় ভূখণ্ড ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় দুই সংগঠনের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষ হয়।
২০১৬ সালে নুসরা ফ্রন্ট আল-কায়েদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সংগঠনটি আরেকটি ধাক্কা খায়। নুসরা ফ্রন্টের নেতা আহমেদ আল-শারা ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। পরে তিনি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন এবং দামেস্ককে পশ্চিমাদের মিত্রে পরিণত করেন।
বর্তমানে আল-কায়েদা কোথায় সবচেয়ে সক্রিয়?
বর্তমানে আফ্রিকার সোমালিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এসব গোষ্ঠী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় শাসনও করছে।
উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সক্রিয় রয়েছে টিটিপি। গত মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদার কাছ থেকে টিটিপি আদর্শগত দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পেয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, টিটিপির নেতৃত্ব এবং তাদের অনেক যোদ্ধা আফগানিস্তানে অবস্থান করছে।



