আফগান মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের নির্দেশ পাকিস্তানের

পাকিস্তান থেকে সম্ভাব্য বহিষ্কারের মুখে থাকা আফগান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীরা মিছিল করেছে- সংগৃহীত ছবি
ইসলামাবাদ ও কাবুলের সম্পর্কের অবনতির মধ্যে পাকিস্তানের মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকা সব আফগান শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (পিএমডিসি)। একই সঙ্গে চলতি শিক্ষাবর্ষে আফগান শিক্ষার্থীদের নতুন ভর্তি, ট্রান্সফার ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়েছে। সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের বিরোধী রাজনীতিক ও মানবাধিকারকর্মীরা। নির্দেশের বিরুদ্ধে রিট পিটিশনও করেছেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী।
পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্মকর্তা বুধবার জানান, পিএমডিসির নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে মেডিকেল ও ডেন্টাল পড়ছেন এমন আফগান শিক্ষার্থীদেরও আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত শুধু আফগান নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
লাহোরের কিং এডওয়ার্ড মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (কেইএমইউ) এরই মধ্যে নির্দেশটি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সেখানে থাকা আফগান শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী।
পিএমডিসি জানিয়েছে সরকারের, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতির ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের দেওয়া আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল স্কলারশিপের আওতায় পড়া আফগান শিক্ষার্থীরাও এ নির্দেশের বাইরে নয়। ২০১৮ সালে অনুমোদিত ওই বৃত্তির দ্বিতীয় ধাপে আফগানদের জন্য ৩ হাজার বৃত্তি বরাদ্দ করা হয়েছিল, যার ৫০০টি মেডিকেল ও ১০০টি ডেন্টাল শিক্ষার জন্য।
তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও আবাসন-সংক্রান্ত নথি থাকা আফগান শিক্ষার্থীরা নিয়ম অনুযায়ী ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করতে পারবেন। মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান বললেন, ‘পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান নীতি, বিধি ও নিয়ম অনুযায়ী আফগান শিক্ষার্থীদের ভিসা বাড়ানোর আবেদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।’
এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের বিরোধী রাজনীতিক ও মানবাধিকারকর্মীরা। সিনেটের বিরোধীদলীয় নেতা আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস একে ‘রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও অন্যায্য সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন। তার ভাষায়, ‘এটি পাকিস্তানের জন্য এক বিরাট দুর্ভাগ্য। আসলে তারা পাকিস্তানেরই ক্ষতি করছে, কারণ এই বিষয়টি একটি দেশের সফট পাওয়ারের অংশ।’
বিরোধী নেতা আসাদ কায়সারও সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেছেন, ‘ইতোমধ্যে যারা পড়াশোনা করছে, তাদের শিক্ষা শেষ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।’
মানবাধিকার কমিশন অব পাকিস্তান বলেছে, বিষয়টি এখন মানবিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে আফগান নারী শিক্ষার্থীদের জন্য। কারণ আফগানিস্তানে তালেবান সরকার নারীদের বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় দেশে ফিরে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইও সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘তরুণদের শিক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রমকে দেশগুলোর রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকে আলাদা রাখা উচিত।’
ইসলামাবাদ-কাবুলের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত এসেছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগান ভূখণ্ডে নিষিদ্ধ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সদস্যদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে, যা তালেবান সরকার অস্বীকার করেছে। এরই মধ্যে পাকিস্তানে থাকা আফগান নাগরিকদের বিরুদ্ধে দেশটির ব্যাপক প্রত্যাবাসন অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে পাকিস্তানে মেডিকেলপড়ুয়া ১৩ আফগান শিক্ষার্থী বৃহস্পতিবার লাহোর হাইকোর্টে পৃথক একাধিক পিটিশন করেছেন। পিটিশনে পাকিস্তান মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (পিএমডিসি) আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়ার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
পিটিশনকারীদের মধ্যে সাতজন নারী ও ছয়জন পুরুষ। অ্যাডভোকেট আসাদ জামালের মাধ্যমে তারা এসব পিটিশন করেন। লাহোরের কিং এডওয়ার্ড মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কলেজ এবং সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তারা পড়াশোনা করছিলেন।
পিটিশনে শিক্ষার্থীরা বলেছেন, পিএমডিসির নির্দেশে তাদের কলেজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট ২০২৩-এর অধীনে দেশের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করার আইনগত ক্ষমতা পিএমডিসি বা সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজগুলোর নেই বলে তারা দাবি করেন।
সূত্র : দ্য হিন্দু, আমু টিভি, টোলো নিউজ, ডন





