বাব আল-মান্দেব হুতিদের কব্জায়, নতুন জটে বিশ্ব জ্বালানি
- টানা ১৮ ঘণ্টার আক্রমণে পিছু হটেছে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী
- বাব আল-মান্দেব শুধু সমুদ্রপথ নয়— এটি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান সংযোগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যেন আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ। একদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতিদের দ্রুত সামরিক অগ্রযাত্রা। এই দুই সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ— বাব আল-মান্দেব প্রণালি।
ইয়েমেনের লোহিতসাগর উপকূলে মাত্র কয়েক দিনের অভিযানে গতকাল শুক্রবার বড় ধরনের ভূখণ্ডগত সাফল্য পেয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা। টানা ১৮ ঘণ্টার দুর্বার আক্রমণে পিছু হটেছে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। লোহিতসাগর উপকূলে হুতিদের দ্রুত অগ্রসর হওয়ার ঘটনাকে প্রশংসা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনির উপদেষ্টা ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোখবের। হুতিদের এই অগ্রগতিকে তিনি একটি ‘অসাধারণ বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি পোস্টে হুতিদের আনুষ্ঠানিক নাম উল্লেখ করে মোখবের লেখেন, ‘এই অসাধারণ বিজয়ের জন্য আনসারুল্লাহকে অভিনন্দন।’
আগের দিন দেশটির কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখলের পর লোহিতসাগরে বিশ্ব জ্বালানির আরেক ‘লাইফলাইন’ বাব আল-মান্দেবের দিকে আরও এগিয়ে গেছে। সর্বশেষ মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবরও এসেছে। এই দ্বীপটি প্রণালির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় এর নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়— এটি এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান সংযোগ। এই পথ দিয়েই লোহিতসাগর হয়ে সুয়েজ খাল ব্যবহার করে পণ্য ও জ্বালানি ইউরোপের দিকে যায়। ফলে এখানে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বের বাজারে।
সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হুতিদের সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার খবরের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর এসেছে। এসব হামলায় জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। পাল্টা হামলায় গত বুধবার হুতি ঘাঁটিতে ৩২টি বিমান হামলাও চালায় সৌদি আরব।
লোহিতসাগর উপকূলে হুতিদের এই দ্রুত অগ্রযাত্রার পেছনে ইরানের সহায়তা রয়েছে বলে ইয়েমেনি, আঞ্চলিক ও ইরানি সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইরান অবশ্য প্রকাশ্যে হুতিদের সামরিক অভিযান সরাসরি পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে অস্ত্র, অর্থ ও সামরিক পরামর্শের মাধ্যমে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হয়েছে এক নতুন কৌশলগত বাস্তবতা। একদিকে ইরানের প্রভাবাধীন হরমুজ প্রণালি, অন্যদিকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের মুখে বাব আল-মান্দেব। দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই যদি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বাব আল-মান্দেব ঘিরে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ সমুদ্রপথ বেছে নিতে হতে পারে। এতে বাড়বে পরিবহন খরচ, সময় এবং বীমা ব্যয়। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ গিয়ে পড়তে পারে জ্বালানি, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে।
এরই মধ্যে (গত বৃহস্পতিবার) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হুতিদের প্রতি সমর্থন বন্ধ এবং হামলা প্রতিহত করতে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদের বার্তা— উত্তেজনা কমানোর কথা বলার পাশাপাশি হুতিদের কাছে অস্ত্র ও সহায়তা পৌঁছানো বন্ধ করতে হবে।
সব মিলিয়ে ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন আর শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, লোহিতসাগরের নৌপথ এবং বিশ্বের জ্বালানিবাজার।



