৪৮ হাজার শিশুকে বই বিতরণ সোহানের

শিশুদের মধ্যে বই বিতরণ করছেন কাজী সোহান শরীফ
খুব ভোরে কুষ্টিয়ার কোনো এক রাস্তায় বা গ্রামের মেঠোপথে কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন কাজী সোহান শরীফ। ব্যাগে বর্ণমালার বই, খাবার স্যালাইন আর স্যানিটারি ন্যাপকিন। পথে পথে ঘুরে সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের মধ্যে বিনামূল্যে বর্ণমালার বই বিলি করেন তিনি। পাশাপাশি বিনামূল্যে বিতরণ করেন খাবার স্যালাইন এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার কালীবাড়ি এলাকার সোহানের শৈশব-কৈশোর কেটেছে চরম অভাব-অনটনে।
সপ্তম শ্রেণি থেকে চাচা আব্দুল মান্নানের সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে সোহান এসএসসি পাস করেন ১৯৯৪ সালে। এরপর কুষ্টিয়া শহরে এসে গাড়িতে আর্টের কাজ করতেন। পরে ২০০০ সালে বীমা কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেন।
সোহান জানিয়েছেন, ২০০২ সালে তিনি বই বিতরণ শুরু করেন খোকসায়। গত ২৪ বছরে পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত প্রায় ৪৮ হাজার শিশুর হাতে তুলে দিয়েছেন বর্ণমালার বই।
শৈশবে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় কষ্ট পাওয়ার স্মৃতি তাকে তাড়ায় বলে ব্যাগে বইয়ের পাশাপাশি সঙ্গী হয়েছে খাবার স্যালাইন। ১৮ বছর ধরে তিনি প্রতি মাসে বিতরণ করছেন ৩০০ থেকে ৪০০ প্যাকেট খাবার স্যালাইন।
প্রায় ৯ বছর ধরে কিশোরী ও মায়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করছেন সোহান। এ পর্যন্ত মায়েদের কাছে প্রায় ১০ হাজার প্যাকেট স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছে দিয়েছেন। পাশাপাশি জরায়ুর ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করছেন। নিজের টাকা এবং বন্ধুবান্ধবের অর্থ সহায়তায় এসব কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ১৮ বছর বীমা কোম্পানিতে চাকরি করার পর তিনি প্রতিবন্ধীদের জন্য সার্জিক্যাল পণ্য তৈরির পেশা বেছে নেন। বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরে নিজের বাড়িতে ছোট পরিসরে হুইলচেয়ার মেরামত ও কৃত্রিম হাত-পা সংযোজনের কাজ করছেন। গরিবদের কাছে এসব পণ্য মুনাফা ছাড়াই বিক্রি করেন।
ইউটিউব দেখে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য তৈরি করেছেন সেন্সরযুক্ত লাঠি ও চশমা। ডেঙ্গু থেকে শিশুদের বাঁচাতে নিজস্ব ফগ মেশিন দিয়ে ড্রেন ও মশার উৎস পরিষ্কার করেন। এমনকি ১০০ ফুট গভীর ও ৯ ইঞ্চি ব্যাসের গর্তে পড়া শিশুকে মাত্র ৫ থেকে ৬ মিনিটে ফ্যান, লাইট, ক্যামেরা ও অক্সিজেন সুবিধাসহ উদ্ধারের জন্য ‘চাইল্ড ক্যাচার’ নামে একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন।
এনজিওকর্মী স্ত্রী ফিরোজা আক্তার, দুই মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া এলাকায় মায়ের পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করেন তিনি।
গত ২৪ বছরে বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাননি তিনি। শুধু কিছুদিন আগে কুষ্টিয়া সদরের সাবেক এক ইউএনও এক টন চাল বরাদ্দ দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন।
কুষ্টিয়া শহরের গৃহকর্মী সেলিনা বেগম জানালেন, সোহান বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন ও বই দেওয়ায় তার মতো গরিব মায়েরা আজ অনেকটা চিন্তামুক্ত।
নিজের কাজ প্রসঙ্গে সোহান বলেছেন, শৈশবের কষ্টের কথা স্মরণ করে আমি শিক্ষার আলো ছড়াতে বছরের ১২ মাস শিশুদের মধ্যে বর্ণমালার বই, স্যালাইন এবং নারীদের মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করে যাচ্ছি। প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘবে সেন্সরযুক্ত লাঠি, চশমা, ফগ মেশিন এবং ‘চাইল্ড ক্যাচার’ যন্ত্র তৈরি করেছি। আমার একটাই চাওয়া, প্রতিটি নাগরিক যেন শিক্ষা পায় এবং কোনো শিশুই যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।
কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ শেখ জানালেন, কাজী সোহানের এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সরাসরি বড় আর্থিক সহযোগিতার সুযোগ সীমিত হলেও আবেদন করলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।



