জ্যোতিষ ফরিদুর রেজা সাগর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কারও সঙ্গে জমিয়ে ফেলতে তিরিশ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে না সাগরের। ফরিদুর রেজা সাগরের কথা বলছি। বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। সে বসে আছে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে। যে যুবক ড্রাইভ করছে, সে খুবই সুদর্শন, স্মার্ট, স্যুট-টাই পরা। নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্ট থেকে সে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে ম্যানহাটনের ব্রিস্টল প্লাজায়। বিশাল দামি কালো রঙের মার্সিডিজ বেঞ্জ। এমিরেটস এয়ারলাইনস থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি আর সাগরের স্ত্রী কণা বসে আছি পেছনের সিটে। যুবকটির সঙ্গে কথা শুরু করল সাগর।
‘তুমি তো ইন্ডিয়ান।’
‘কী করে বুঝলে?’
‘আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারি। তুমি পাঞ্জাবের।’
‘হ্যাঁ ঠিক।’
‘তোমার নাম?’
‘পঙ্কজ।’
‘পঙ্কজ, তুমি সামনের দীপাবলিতে বাড়ি যাচ্ছ।’
‘হ্যাঁ, যাচ্ছি তো।’
‘গিয়েই বিয়ে করবে। তোমার বউ ঠিক করা আছে।’
‘আশ্চর্য ব্যাপার, সবই ঠিকঠাক মিলে যাচ্ছে। তুমি এসব বলছ কী করে?’
‘আমি আরও অনেক কিছুই বলতে পারি। চাইলে তোমার হবু স্ত্রীর নামটিও বলে দিতে পারি।’
যুবক যেন গাড়ি চালাতে ভুলে গেল। আমি পেছনে বসে বাকরুদ্ধ হয়ে আছি। কণা নির্বিকার। তার মুখে হাসি। কথা বলছে না।
সাগর বলল, ‘পঙ্কজ, তুমি কি তোমার স্ত্রীর নাম জানতে চাও?’
পঙ্কজ কোনোরকমে বলল, ‘জানতে চাই, জানতে চাই।’
‘আসলেই জানতে চাও?’
‘আসলেই জানতে চাই।’
যুবকের মুখের দিকে তাকিয়ে সাগর নির্লিপ্ত স্বরে বলল, ‘মিসেস পঙ্কজ।’
যুবক হো হো করে হাসতে লাগল। পেছনে বসা আমিও হাসছি। কণা হাসিমুখে বলল, ‘এই হচ্ছে সাগরের জ্যোতিষীবিদ্যা।’
সাগর এরকমই। মানুষকে চমকে দিতে ভালোবাসে। তার উপস্থিত বুদ্ধির তুলনা নেই। ‘চ্যানেল আই ভবন’-এ তার রুমটি আসলে একটা মিউজিয়াম। অদ্ভুত অদ্ভুত সব জিনিসে ভর্তি। টেবিলে ছোট ছোট অজস্র বস্তু। হয়তো একটা প্লাস্টিকের পাখি বসে আছে এক কোণে। ছুঁয়ে দিলেই ডাকতে শুরু করে। একটা বাক্সের ডালা খুললেই ফণা তুলবে একটা সাপ। চমকে দেওয়ার জন্য সাগর হয়তো বলবে, ‘ওই বাক্সটা খোল, মজার জিনিস আছে।’ খুললেই দেখা যাবে লাফিয়ে উঠেছে একটা পুতুল। চমক! আমি সাগরকে ফোন করে বললাম, ‘বিকেলে আসব।’ সাগর সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আসো। তোমার জন্য নাটোরের প্যারা সন্দেশ আনিয়ে রেখেছি।’ জানে আমার ডায়াবেটিস। তারপরও নানা রকমের মিষ্টি সে আমাকে খাওয়াবেই। হাতখানেক লম্বা একেকটা সাগরকলার ফানা রাখা তার টেবিলে। ফর্মালিনমুক্ত, ফ্রেশ। ওই সাইজের একটা খেলে ডিনার করার দরকার হবে না। সাগরের ওখানে গেলে ওই রামসাইজের কলা একটা খেতে হয়। মানুষকে খাওয়াতে এত ভালোবাসে কেউ, সাগরকে খুব কাছ থেকে না দেখলে এ আমার জানাই হতো না। এবার নিয়ে দ্বিতীয়বার তার সঙ্গে আমেরিকায় গেলাম। সাগরের রুমে প্রতিদিনই আসছেন নিউ ইয়র্কে বসবাস করা শিল্প-সংস্কৃতির মানুষজন। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসছেন। টেবিলভর্তি খাবার। একবার সেদিকে তাকিয়ে হয়তো আরও কিছু খাবারের অর্ডার দিয়ে দিল সাগর। রাগে ফেটে পড়ছে কণা। ‘এত খাবার কে খাবে? খাবার নষ্ট করা আমি পছন্দ করি না।’ সাগর নির্বিকার। সে গিয়েছে চিকিৎসা করাতে। শরীর যে খারাপ, তাকে দেখে বা তার আচরণে কেউ তা বুঝতেই পারবে না। সমানে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছে। গল্পগুজব হাসি আনন্দে মাতিয়ে রাখছে সবাইকে। আমার তিপ্পান্ন বছরের পুরনো বন্ধু। তারপরও এবার ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা এবং দুই সপ্তাহ নিউ ইয়র্কে সাগরের সঙ্গে কাটাবার পর মনে হলো, আমি এক নতুন সাগরকে আবিষ্কার করলাম। সাগরের লেখা কিছু বইও পড়া হয়ে গেল সেই ফাঁকে। সেখানেও দেখি এক নতুন সাগর। খুবই সহজ সরল ঘরোয়া ও আন্তরিক গদ্যভঙ্গিতে প্রিয়জনদের নিয়ে লেখা তার স্মৃতিকথাগুলো অসামান্য। আমি লেখক ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন করে ভক্ত হয়ে গেলাম। সাগরের জীবন এই এতগুলো বছর ধরে আমি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। হেলিকপ্টার অ্যাকসিডেন্টে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপা, তিনি আমার বন্ধুটিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তার পর থেকে কয়েকটি অপারেশন। কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশান। করোনায় আক্রান্ত হওয়া। এইসব ভয়ংকরতা জয় করে সাগর আগের মতোই আবার দাঁড়াতে পেরেছে। মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা ও দোয়ায় সে এসব জয় করতে পেরেছে। অসম্ভব মাতৃভক্ত সাগর, মা বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের মৃত্যুতেও নিউ ইয়র্ক থেকে ঢাকায় ফিরতে পারেনি। তখন করোনাকাল। মা নিঃশব্দে চলে গেলেন। সেই বেদনায় এখনো ম্রিয়মাণ হয়ে থাকে সাগর।
এবার সাগরের আসল জ্যোতিষীর কথা বলি। বছর বিশেক আগের কথা।
স্থান, কুইন্সমল, নিউ ইয়র্ক সিটি। ফরিদুর রেজা সাগর, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, লুৎফর রহমান রিটন ও আমার নিউ ইয়র্কে স্থায়ীভাবে বসবাস করা বন্ধু সৌরভের সঙ্গে আমিও আছি। মলের বাইরের দিককার একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছি। সেবারও সাগর আমাকে আমেরিকায় নিয়ে গেছে। বন্যার একক রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান হবে। আমাকে নিয়ে গেছে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করার জন্য। সেই বিকেলে আমরা বেরিয়েছিলাম কফি খেতে খেতে আড্ডা দেওয়ার জন্য। যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছি, তার পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে এলো এক মেয়ে। হাতে ব্যাগ। বাঙালিদের বাঙালি চিনতে ভুল হয় না। আমরা বুঝে গেলাম মেয়েটি বাঙালি। বাংলাদেশের। রাস্তা ক্রস করে সে আমাদের দিকে এগিয়ে এলো। নিশ্চয়ই বন্যার ভক্ত হবে। চোখে লাগার মতো সুন্দরী। আশ্চর্য ব্যাপার, মেয়েটি অন্য কারও দিকেই তাকাল না, আমার সামনে এসে দাঁড়াল। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বলল, সে আমার খুবই ভক্ত। নিউ ইয়র্কে আমাকে দেখে তার ভালো লাগছে। কদিন নিউ ইয়র্কে থাকব, কী লিখছি, এইসব খবর নিতে লাগল। তার হাতের ব্যাগটিতে কী আছে, বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই।
এই সময় জ্যোতিষকর্মটা সাগর করল। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তার স্বভাবসুলভ রহস্যমাখা স্বরে বলল, ‘আপনার ব্যাগে মিলনের একটা বই আছে।’
মেয়েটি হতভম্ব। আর আমরা এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি। সে কী করবে, বুঝতে পারছে না। সাগর আবার বলল, ‘আমার ভুল হয়নি। আপনার ব্যাগে মিলনের বই আছে। বের করুন না, প্লিজ।’
মেয়েটি লাজুক ভঙ্গিতে ব্যাগে হাত দিয়ে সত্যি সত্যি আমার একটা বই বের করল। বইয়ের নাম ‘পর’। বিস্ময়ে আমাদের সবার চোখই ছানাবড়া। এ কী করে সম্ভব! ব্যাগে কী আছে, না আছে, তা ওই ব্যাগ দেখে বোঝার কোনো উপায়ই নেই! সাগর কী করে বলল, ব্যাগে আমার বই আছে! তারপর বহুদিন বহুভাবে সাগরের কাছে জানতে চেয়েছি, ‘এ তুমি কী করে পেরেছিলে, সাগর?’ সাগরের সহাস্য জবাব, ‘আমি তো জ্যোতিষী। অনেক কিছুই আগাম বলতে পারি।’
আমার বন্ধু ফরিদুর রেজা সাগর এরকমই। নিজের ভেতরে কিছুটা রহস্য জমা করে রাখে।



