সারা জীবনের উপার্জনে স্কুল করেছেন রেখা

বিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন রেখা রানী
বিয়ে করেননি। অথচ শত শত মেয়েকে নিজের সন্তানের মতো করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে দিতে জীবনের সব সঞ্চয় বিলিয়ে দিয়েছেন রেখা রানী ওঝা (৭৭)। সরকারি হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে এসে প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি বিদ্যালয়।
রেখা রানীর বাড়ি যে এলাকায়, সেখান থেকে কাছের স্কুলটিতে যেতেও মেয়েদের অনেক কষ্ট করতে হতো। বিল এলাকা হওয়ায় পানি-কাদা ঠেলে স্কুলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তিনি চাকরি পাওয়ার পর থেকেই নিজের কষ্ট করে পড়ালেখার কথা মনে করে এলাকায় মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করতে থাকেন; যেখানে মেয়েদের জন্য হোস্টেল থাকবে, যাতে করে দূরের শিক্ষার্থীরা সেখানে থেকে পড়ালেখা করতে পারে। সেই থেকে রেখা রানী শুরু করেন সঞ্চয়।
রেখা রানী চাকরি থেকে অবসরে যান ২০১২ সালে। এরপর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বুরুয়া গ্রামে তার জমিতে নিজ নামে ‘কুমারী রেখা রানী গার্লস হাইস্কুল’প্রতিষ্ঠা করেন ২০১৪ সালে। বিদ্যালয়টি গড়ে তুলতে সারা জীবনের উপার্জন ও সঞ্চয় ব্যয় করেছেন। মাত্র একজন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয়েছিল স্কুলটির পথচলা। এক যুগের ব্যবধানে সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে শতাধিক। এখানে পাঠদান করছেন ছয় শিক্ষক। তবে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ে মাঝেমধ্যে রেখা রানীও ক্লাস নেন।
রেখা রানী জানিয়েছেন, এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেওয়া হয় না। তবে পরীক্ষার আগে ফি বাবদ সামান্য কিছু টাকা নেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও একরকম বিনা বেতনে পাঠদান করছেন। দীর্ঘদিন বেতন না পেয়ে তারা আর্থিক কষ্টে আছেন।
রেখা রানীর ত্যাগের কথা শুনে সম্প্রতি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেখা রানী। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা জটিল রোগ। এর মধ্যে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির সঙ্গেও লড়ছেন তিনি। তবে নিজের চিকিৎসা, বার্ধক্য কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার চেয়ে বেশি চিন্তা— তার স্বপ্নের বিদ্যালয়টি কীভাবে টিকে থাকবে।
রেখা রানীর নিজের সন্তান নেই, কিন্তু শত শত মেয়ের শিক্ষার স্বপ্নকে নিজের সন্তানের স্বপ্নের মতো লালন করছেন তিনি। তাই শেষ বয়সে তার একটাই আকুতি, ‘আমি হয়তো আর বেশি দিন থাকব না। তবে আমার হাতে গড়া স্কুলটি এমপিওভুক্ত হয়েছে— এটি দেখে যেতে চাই।’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন বলেছেন, বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত না হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।



