অদ্ভুতুড়ে অনিয়ম চিটাগং ক্লাবে

২০২৫ সালে ক্লাবের বারে ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকার মদ বিক্রি হয়। এই মদ কোথা থেকে আমদানি হলো; কিংবা কার কাছ থেকে কেনা হলো, এর কোনো উৎস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিজেরা আমদানিও করেনি। যারা আমদানি করেন তাদের কাছ থেকেও কেনার তথ্য নেই। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ভেজাল মদে মারাত্মক স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে না তো! আর এই ভেজাল ও নিম্নমানের মদ চোরাবাজার থেকে কম দামে কিনে বেশি দামে সরবরাহ করছে ক্লাবেরই কয়েকজন। এরকম মারাত্মক অনিয়মের বিষয়টি প্রথম সামনে আসে ক্লাব মেম্বার (বার ইনচার্জ) মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও বারের ম্যানেজার কাজী আব্দুর রহমানের ব্যাংক হিসাবে লাখ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য ফাঁসের পর।
নজিরবিহীন অনিয়মের এ ঘটনাটি ঘটেছে দেশের অভিজাত পাবলিক ক্লাব দি চিটাগং ক্লাব লিমিটেডে।
ক্লাবের এক সদস্য মদ আমদানি, ক্রয়, সংরক্ষণ, বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সব লাইসেন্স, আমদানি দলিল, কাস্টমস শুল্ক কর-সংক্রান্ত নথি প্রদান করতে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন ক্লাবের চেয়ারম্যান শোভন শাহাবুদ্দিন রাজ, ভাইস চেয়ারম্যান সায়েদুল আনোয়ার ফরহাদ, মেম্বার (বার ইনচার্জ) মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ পাঁচজনকে।
বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য ক্লাবের এক প্রবীণ মেম্বার একটি চিঠি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য ক্লাবের সিনিয়র মেম্বার ও সাবেক চেয়ারম্যান ড. মঈনুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন দিলেও সেটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম ক্লাবের চেয়ারম্যান শোভন শাহাবুদ্দিন রাজের কাছে জানতে চাইলে তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘কেন, আপনি কী করবেন?’ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করা হবে বলার পর বললেন, ‘তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে এখন কিছু বলা যাবে না।’ অথচ তদন্ত কমিটির আরেক সিনিয়র সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আলী আহমেদ বললেন, ‘এক মাস আগে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন শেষ করেছি আমরা। এতে অনেক কিছু পাওয়া গেছে।’
এ ঘটনায় ক্লাবের প্রায় দুই হাজার মেম্বারের অধিকাংশের মধ্যেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ক্লাব ও নিজেদের মানসম্মানের ভয়ে কেউ এ নিয়ে প্রকাশ্য কথা বলছেন না তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রভাবশালী ক্লাব মেম্বার ক্ষোভ ঝেড়ে বললেন, ‘এই অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমি নিজে গত দেড় বছরে ক্লাব বারের কোনো জিনিস খাইনি। আগে খেলেই শারীরিকভাবে অস্বস্তিবোধ করতাম।’
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বনেদি ও ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবের মেম্বার হওয়ার জন্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। যদিও বর্তমানে ক্লাব মেম্বারশিপ দেওয়া স্থগিত রয়েছে।
চোরাবাজার থেকে মদ কেনার টাকা পরিশোধ করতে ক্লাবের তহবিল থেকে ট্রাস্ট ব্যাংকের নগদ চেকে (চেক নম্বর সি-৮৮৯৭৬৩৫ ও ৮৮৯৭৬৩৬) ৩৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে অনৈতিকভাবে। এ ধরনের পাওনা অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেক বা পে অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধের নিয়ম থাকলেও গত বছরের ২৭ জুলাই পৃথক দুই ‘নগদ চেকে’ এই টাকা একসঙ্গে উত্তোলন করা হয়। অনিয়ম ও দুর্নীতি ফাঁস হয়ে যাবে— এই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তড়িঘড়ি ক্লাবের বার ম্যানেজার কাজী আব্দুর রহমানকে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। যাতে ঘটনা পুরো ফাঁস হয়ে না যায়। বার ম্যানেজার কাজী আব্দুর রহমানকে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। এরপর আবার ফোন করা হলে তিনি আর ধরেননি।
ক্লাবের সদস্য মোরশেদ আরিফ চৌধুরী (কোড নম্বর-সি-১৭০) গত ১৬ আগস্ট অ্যাডভোকেট অলক কান্তি দাশের মাধ্যমে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন ক্লাবের চেয়ারম্যানের কাছে। নোটিসে মদ কেনাবেচা ও হিসাব-সংক্রান্ত অনিয়ম, অর্থ উত্তোলন, তদন্ত প্রতিবেদন গোপন রাখা ইত্যাদি বিষয়ে আইনি প্রতিকার দাবি করা হয়। এ প্রসঙ্গে মোরশেদ আরিফ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেছেন, ‘অনিয়মের তথ্য জানতে চেয়ে সাতবার আবেদন করেও কোনো সাড়া পাইনি। এবার নোটিসের গুরুত্ব দেওয়া না হলে আমি আদালতের আশ্রয় নেব। এখানে একটি চক্র জড়িত। তারা ক্লাবকে অনিয়মের মাধ্যমে কুক্ষিগত করে রেখেছে। এতে ক্লাবের ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’



