পিকে হালদারের কুমিরগুলোর এখন কী হবে

ছবি: আগামীর সময়
নদীতে কুমির থাকলে গোসলে নামতে মানা! এই ভয়কে জয় করতে চেয়েছিলেন ময়মনসিংহের ভালুকার দুই যুবক। উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে দুই দশক আগে ১৩ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর বুনলেন এই সরীসৃপের খামার করার স্বপ্ন। ২০০৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে ৭৫টি কুমির এনে গড়লেন রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড। দ্রুত সাফল্য পেলেও বিক্রি করতে গিয়ে বাধে বিপত্তি। সেই সংকট কাটিয়ে এক দশক পর প্রথম চালানে বিদেশ যায় প্রায় ৪৫০ চামড়া। দেশে আসে আড়াই লাখ ডলার। সেই ‘ডলারের ডিমপাড়া’ কুমিরগুলোর কপালে এখন শুধুই দুর্দশা। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেউ এসে এদের যত্ন নেবে, নিয়মিত খাবার দেবে, চিকিৎসা করবে— সেই আশায়।
দেশে প্রথম কুমির খামারটি করেছিলেন স্বপ্নবাজ লেখক ও উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদ এবং মেজবাউল হক। ২০০৩ সালে প্রস্তুতি শুরু করলেও কুমির আমদানি করেন পরের বছর।
যাত্রার পর এই সরীসৃপের মূল্যবান অংশ বিক্রি করা নিয়ে জটিলতায় পড়লে ২০১২ সালে শেয়ার হস্তান্তর করেন মুশতাক ও মেজবাউল। চাপে পড়ে রেপটাইলস ফার্মের শেয়ার বিতর্কিত ব্যবসায়ী পি কে হালদারের কাছে বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে। খামারটি বন্দক রেখে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ নিয়েছিলেন পি কে হালদার। ২০১৯ সালে ভারতে গ্রেপ্তার হন এই বিতর্কিত ব্যবসায়ী। এরপর ঋণের টাকা তুলতে ফার্মটি বিক্রি করে দেয় লিজিং প্রতিষ্ঠান। এর আগেই ২০১৪ সালে ৪৩০, ২০১৫ সালে ৪০০, ২০১৬ সালে ২০০, ২০১৮ সালে ২২৬ ও সর্বশেষ ২০১৯ সালে ২৫১টি কুমিরের চামড়া রপ্তানি করা হয় জাপানে। রপ্তানি শুরুর প্রথম পাঁচ বছরে ফার্মটি থেকে ১ হাজার ৫০৭টি চামড়া রপ্তানি করা হয়। যার প্রতিটির দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। দ্বিতীয় দফায় হাত বদল হলে ২০২০ সাল থেকে অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও খামখেয়ালিপনায় কুমিরের চামড়া রপ্তানির তথ্য নেই। প্রাণীগুলোর ওপর নেমে আসে অযত্ন ও অবহেলা।
২০২২ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ কুমির খামার পরিচালনায় গঠন করা হয় ছয় সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ। এই কমিটি ২০২৩ সালে নিলামের মাধ্যমে খামারের জমি ও কুমির ৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয়। কিনে উদ্দীপন নামে এনজিও।
বেসরকারি এই সংস্থার কর্মকর্তাদের দাবি, খামারটি কিনলেও নবায়ন করা যায়নি লাইসেন্স। এতে বিক্রি করা যায়নি কোনো চামড়া। উল্টো প্রতিটি কুমিরের জন্য বার্ষিক ১ হাজার টাকা করে সরকারি রাজস্ব, ২০ জন কর্মীর বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে হিমশিম খায় উদ্দীপন। এখন মাত্র ১০ কর্মী দিয়ে এত বিশাল খামার শুধু পাহারা দেওয়া হচ্ছে, যত্ন বলতে তেমন কিছুই হচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খামারটির যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা। ভেঙে গেছে কুমিরগুলোর পুকুরের পাড়, সংরক্ষণ করা হয় না ডিম। নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে না খাবার। স্বাস্থ্যসেবা তো দূর কি বাত। এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইলে মুখ খুললেন না খামারের কোনো কর্মী। তাদের একটাই কথা, গণমাধ্যমে কথা বলতে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা আছে। এমনকি কোনো প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে কি না, সেটিও জানালেন না কেউ।
রপ্তানি নিয়ে সন্দেহজনক তথ্য: ২০২৩ সালের মে মাসে রেপটাইল ফার্মে ছোট-বড় মিলে ৩ হাজার ৭০০টি কুমিরের তথ্য দিয়েছিল ফার্ম কর্তৃপক্ষ। ছয় বছরে কোনো কুমিরের চামড়া রপ্তানির তথ্য নেই। তিন বছর পর এসেও দেওয়া হচ্ছে একই তথ্য। ওই সময় ৪০০ কুমিরের চামড়া রপ্তানি উপযোগী ছিল। পরিবর্তন আসেনি সেই সংখ্যাতেও। এমতাবস্থায় তাদের এ তথ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। আসলেই রপ্তানি হয়নি, না গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে, নাকি অবহেলা অযত্নে কুমির মারা যাচ্ছে— সেসব প্রশ্নের জবাব চাইতে গেলে মুখ খুলতে রাজি হননি খামারের কোনো কর্মকর্তা। অথচ জন্মের তিন বছরেই রপ্তানি উপযোগী হয় প্রতিটি কুমির।
আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি উদ্দীপনের: কুমির লালন-পালনে লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। লাইসেন্স ব্যতীত এই সরীসৃপ লালন-পালন, খামার স্থাপন বা আমদানি-রপ্তানি না করার বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে তিন বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়াই কুমির পালন করছে উদ্দীপন।
সরকারি নীতিমালা: ২০১৯ সালের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪ নম্বরে বলা আছে, কোনো খামারি এই বিধিমালার অধীন লাইসেন্স ছাড়া কুমির লালন-পালন, খামার স্থাপন বা আমদানি-রপ্তানি করতে পারবে না। একই অধ্যায়ের ৭-এর ১ নম্বরে বলা হয়েছে, লাইসেন্স পাওয়ার পর কোনো খামারি পজিশন সার্টিফিকেট ব্যতিত কুমির নিজ মালিকানায় বা দখলে রাখতে পারবে না। বন বিভাগের কুমির লালন পালনের নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি কুমিরের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা পজিশন ফি নির্ধারিত, যা এই ব্যবসার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা বলে জানালেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
লাইসেন্স ছাড়া কীভাবে তিন বছর ধরে কুমির পালন করছে উদ্দীপন— এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিলেন না বন সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) ছানাউল্যা পাটওয়ারী। তার ভাষ্য, ‘উদ্দীপনের লোকজন একবার আমার কাছে আসছিল। ওই সময়ে তাদের ফার্মটি হস্তান্তরের সঠিক কাগজপত্রসহ লাইসেন্স আবেদন করতে বলা হয়েছিল। তবে এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। উদ্দীপনের লাইসেন্স না থাকলেও প্রাণীগুলো অবৈধ নয়, যেহেতু রেপটাইলস ফার্মের নামে লাইসেন্সে আছে।’



