ব্রিকস বর্জন কেউ বলছেন যৌক্তিক, কারও কাছে সুযোগ হাতছাড়া
- আমন্ত্রণ পেয়েও সম্মেলনে অনুপস্থিতি
- রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দিক থেকে যৌক্তিক মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ
- আরেকাংশের মতে, কূটনৈতিক যোগাযোগের মূল্যবান সুযোগ হয়েছে হাতছাড়া

ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক লাভ-ক্ষতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নে সরকারের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। আবার কেউ বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতির সুযোগ হাতছাড়া করেছে বাংলাদেশ।
ভারতের নয়াদিল্লিতে আজ শেষ হচ্ছে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলন। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল। শেষ পর্যন্ত সম্মেলন শুরু হওয়ার এক দিন আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়ে দেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে যাচ্ছেন না। এমনকি বাংলাদেশ কোনো প্রতিনিধিদলও পাঠাচ্ছে না।’ কেন যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে যথাযথভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে এ সিদ্ধান্তের কূটনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকস এখন শুধু অর্থনৈতিক জোট নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। ফলে সেখানে বাংলাদেশের উপস্থিতি দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করত। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক রয়েছে। সম্মেলনে চীন ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট অংশ নেওয়ায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগেরও সুযোগ তৈরি করতে পারত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের (বিসিআইপিএ) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নুরুল হুদা সাকিব মনে করেন, অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় অবস্থান থেকে যৌক্তিক।
আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও সম্পর্ক রয়েছে।’ তার মতে, প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে গেলে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহল প্রশ্ন তুলত, ভারত সফর থেকে তিনি কী অর্জন করলেন। যথাযথ সম্মান দেখিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, তারপরও কেন অংশ নিলেন— এমন প্রশ্নও উঠত।
ড. নুরুল হুদা সাকিব আরও বললেন, ‘এতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্ন তৈরি হতে পারত। সে বিবেচনায় সরকারের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক নয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, ব্রিকস বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। এখানে উপস্থিতি সরাসরি আর্থিক লাভ না দিলেও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দিতে পারত।
অন্যদিকে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী মনে করেন, বাংলাদেশের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা উচিত ছিল। তিনি বললেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুপক্ষীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এসব আয়োজনে উপস্থিতি কূটনৈতিক পরিপক্বতারও প্রমাণ।
তার মতে, ‘বাংলাদেশ নিজেই ব্রিকসের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করে রেখেছে। অথচ আমন্ত্রণ পাওয়ার পরও সম্মেলনে অংশ না নেওয়া বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’ যথাযথ আমন্ত্রণ না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সাকিব আলী উল্লেখ করেন, ‘এটি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সফর নয়। তাই আমন্ত্রণের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
তার মতে, ব্রিকসে প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করত। আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশকে ভিন্নভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পেত।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতে ব্রিকসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।



