পাসপোর্ট অফিসে টাকা ছাড়া মেলে না সেবা
- সার্ভার, নেটওয়ার্ক সমস্যার অজুহাত
- ভুল ধরে আবেদন আটকে রাখার অভিযোগ
- প্রতিদিন ১৫০টি আবেদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সম্পন্ন হয় দালালের মাধ্যমে
- দালাল ছাড়া কাজ করতে গেলে ঘুরতে হয় দিনের পর দিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে ভোগান্তির যেন শেষ নেই। দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। কখনো সার্ভার, কখনো নেটওয়ার্ক, আবার কখনো আবেদনের ভুল ধরে আটকে রাখা হয় সেবাপ্রার্থীদের আবেদন। অথচ দালালের হাতে বাড়তি টাকা দিলেই বদলে যায় চিত্র। লাইনে দাঁড়ানোর দরকার নেই। ঘোরাঘুরিও নেই। ছবি আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিলেই পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়ার মেলে আশ্বাস।
এই বাড়তি টাকার অঙ্কও কম নয়। অফিস সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৫০টি আবেদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দালালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি আবেদনে গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হলে দিনে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা; ২২ কার্যদিবস ধরে মাসে প্রায় ৩৭ লাখ টাকা, আর বছরে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। দালালদের এই অর্থে আনসার এবং পাসপোর্ট অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাগও থাকে— এমন তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে।
গত ২, ৩ ও ৬ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে সরেজমিন অনুসন্ধান চালান এই প্রতিবেদক। গ্রাহক সেজে কথা বলেছেন একাধিক দালাল এবং সেবাপ্রত্যাশীর সঙ্গে।
৬ সেপ্টেম্বর সকালে পাসপোর্ট অফিসে ঢুকতেই সানিল নামে এক দালাল প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পাসপোর্ট করার নিয়ম জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আপনি যদি আমাদের মাধ্যমে করেন, তাহলে এ টু জেড আমরা কাজ করে দেব। আপনাকে শুধু ছবি তুলতে হবে, বাকি কাজ আমরা করে দেব।’ খরচের কথা জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘সাধারণভাবে করলে ১০ বছরের জন্য পাসপোর্ট করতে সব মিলিয়ে খরচ পড়বে সাড়ে ৭ হাজার টাকা।’ এরপর প্রতিবেদককে টাকার ভাগও জানালেন সানিল। তার ভাষায়, ‘এর মধ্যে অফিসের ১ হাজার ২৫০, আর ২৫০ টাকা আমরা নিই।’ সানিলের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি ফির বাইরে আরও ১৫০০ টাকা দিতে হবে।
শুধু সাধারণ সেবায় নয়, জরুরি ও অতি জরুরি পাসপোর্টের জন্যও আলাদা অঙ্ক জানালেন তিনি। তার দাবি, জরুরি ভিত্তিতে সাড়ে ১০ হাজার এবং অতি জরুরি ভিত্তিতে করাতে ১৪ হাজার টাকা লাগবে। অথচ ৪৮ পৃষ্ঠার ১০ বছরমেয়াদি সাধারণ পাসপোর্টের সরকারনির্ধারিত ফি ৫ হাজার ৭৫০ টাকা। জরুরি ভিত্তিতে ৮ হাজার ৫০ এবং অতি জরুরি ভিত্তিতে ১০ হাজার ৩৫০ টাকা।
এখানেই শেষ নয়। ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে রেজা (ছদ্মনাম) নামের আরেক দালালের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। পাঁচ বছরের পাসপোর্টের খরচ জানতে চাইলে তিনি জানালেন, মোট ৬ হাজার টাকা দিলেই পুরো কাজ করে দেবেন। রেজা বললেন, ‘এই টাকা দিলে আপনাকে কিছুই করতে হবে না। লাইনেও দাঁড়াতে হবে না। শুধু যাবেন, ছবি তুলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেবেন, চলে আসবেন।’ এরপর তিনি টাকার হিসাবও দেন। বলেছেন, ‘৪ হাজার ২৫ টাকা লাগে ব্যাংক ড্রাফট করতে। অফিসকে দিতে হয় ১ হাজার ২০০ আর আমার থাকবে ৫০০ টাকা।’ একই সময়ে অফিসের আশপাশে তারেক, পলাশ ও জাহাঙ্গীরসহ অর্ধশতাধিক দালালকে অফিস ও এর আশপাশের রাস্তায় সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়া যায়। সরেজমিন অফিসের আশপাশে দালালদের অন্তত ৪০টি চেম্বার ও কম্পিউটারের দোকান দেখা গেছে।
পাসপোর্ট অফিস সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৫০টি আবেদন জমা পড়ে। এর তিন-চতুর্থাংশ অর্থাৎ দিনে প্রায় ১১২টি আবেদন দালালদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
২ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ফটকের সামনে অবস্থান করে দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্যকে অন্তত তিনজন সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলতে দেখা যায়। তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করে দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদকের নজরে আসে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই আনসার সদস্য বললেন, ‘আমি কোনো টাকা নিইনি। মাঝেমধ্যে গ্রাহকদের একটু সহযোগিতা করি।’
রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী থেকে আসা সনেট বললেন, ‘আমি কোনো দালাল না ধরে নিজেই পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু তিন দিন ধরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার জন্য ঘুরছি। এখন পর্যন্ত আঙুলের ছাপ দিতে পারিনি। নানা ভুল ধরে এভাবে তিন দিন ঘুরিয়েছে।’
পাসপোর্ট অফিসের একটি সূত্রের দাবি, প্রতিদিন দেড় শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবেদনে তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে। জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের গরমিল নিয়েও অনেকে সমস্যায় পড়েন। এ ধরনের জটিলতা হলে সাধারণ সেবাপ্রার্থীর সামনে বাড়তি সময় ও ঘোরাঘুরির চাপ সৃষ্টি হয়। আর সে জায়গাটিতেই দালালরা কাজে লাগাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে দেখা গেছে।
তবে রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. মোক্তার হোসেন অফিসের সঙ্গে দালালদের যোগসাজশের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ‘পাসপোর্ট অফিসের সীমানার মধ্যে কোনো দালাল প্রবেশ করতে পারে না। দালালরা নিজেরা বাঁচার জন্য অফিসের লোকজনের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে।’ তবে অফিস কক্ষের মধ্যে দালালদের প্রবেশ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের তথ্য-প্রমাণ থাকার কথা জানানো হলে তিনি এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।



