ডাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কার
স্থান পেল জিন্নাহর ছবি, নেই শেখ মুজিবের গৌরবোজ্জ্বল ছবি

ডাকসুর সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি। ছবি: আগামীর সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) সংস্কার করা সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থান পেলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি না থাকায় তৈরি হয়েছে বিতর্ক। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এমন বিন্যাস কেন করা হলো।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংস্কার করা সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। এ সময় ছিলেন ডাকসুর সহসভাপতি সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদসহ অন্যরা।
উদ্বোধনের পর সংগ্রহশালা ঘুরে দেখা যায়, সেখানে স্থান পেয়েছে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান, পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন স্থিরচিত্র।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি দেখা যায়। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত অনুষ্ঠানের ছবি। ওই অনুষ্ঠানে জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ এ ছাড়া রয়েছে ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি-সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার একটি পেপারকাটিং।
এ ছাড়া সংগ্রহশালায় আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি আতাউল গণি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবিও রয়েছে। ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং তার ছবি-সংবলিত তিনটি পেপারকাটিংও রাখা হয়েছে সেখানে।
তবে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক বা গুরুত্বপূর্ণ ছবি সেখানে দেখা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবিও স্থান পেয়েছে সংগ্রহশালায়। এসবের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের একটি খোদাইচিত্রে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি।
বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল ছবি না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে গণমাধ্যমকে ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই এখানে রাখা হয়নি। আর ৭২ থেকে ৭৫ সালের অংশে তো তার ছবি আছে।’
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়ের অংশে বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।’
জিন্নাহর ছবি কেন রাখা হয়েছে, জানতে চাইলে জুমা বলেন, ‘আমি জিন্নাহর ছবি রাখিনি, সেই ইভেন্টের ছবি রেখেছি।’
সংগ্রহশালার বিভিন্ন অংশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ১৪টি স্থিরচিত্রও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শহীদ নূর হোসেনের শরীরে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তিপাক’ লেখা ঐতিহাসিক ছবিটি, ডাকসুর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শহীদদের তালিকা এবং শহীদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার ছবিও।
২০০৯ সালের পরের সময়ের মধ্যে ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন, বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদি বিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি রাখা হয়েছে। তবে ১৯৯১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ের উল্লেখযোগ্য কোনো স্থিরচিত্র পাওয়া যায়নি। সংগ্রহশালায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার একটি ছবিও রাখা হয়েছে।
সাহিত্যিকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন আহমেদ, কবি জসীমউদ্দীন, আবুল কাশেম ফজলুল হক, মুনীর চৌধুরী ও আবুল ফজলসহ কয়েকজনের ছবি রয়েছে।
এ ছাড়া শরীফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর থেকে তার মরদেহ আনা, জানাজা ও দাফনের ছবিও স্থান পেয়েছে সংগ্রহশালায়।
সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে জিন্নাহর ছবি রাখার অভিযোগের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী হওয়া নূমান আহমাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘লোকমুখে জানতে পারলাম, সেখান থেকে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে ফেলে পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি টাঙানো হয়েছে।’
নূমানের অভিযোগ, বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিতর্কিত সময়ের ছবি রেখে তার নেতৃত্বে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে আড়াল করা হয়েছে।
ডাকসুর এক সাবেক নেতা বলেন, ‘এর আগে কখনো জিন্নাহর ছবি ডাকসুতে ছিল না। ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্র সংসদে আসার পর এ ছবি যুক্ত করেছে।’
তবে এ বিষয়ে শিবিরের বক্তব্য জানা যায়নি। সংগ্রহশালায় বর্তমানে কোনো তত্ত্বাবধায়ক নেই। এর আগে গোপাল চন্দ্র দাস সেখানে দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি জীবনেও ছিল না। আমি ১৯৯১ সাল থেকে এখানে কাজ করি। এ সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা থেকে আমি সব দুর্লভ ছবি সংগ্রহ করেছি।’
বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকার বিষয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখানে অনেক দুর্লভ কিছু ছবি ছিল। তাও শেষ করে ফেলছে শিবির। কী আর বলব!’
এদিকে ডাকসুর বোর্ডে ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী সহসভাপতি নুরুল হক নুরের নাম থাকলেও সাধারণ সম্পাদক পদটি খালি রাখা হয়েছে। ওই নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। পরে ছাত্রত্ব না থাকা অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর তার পদ বাতিল করে ওই মেয়াদে রাশেদ খানকে ডাকসুর জিএস ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জিএস পদটি খালি রাখার বিষয়ে ডাকসুর বর্তমান জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ‘রাব্বানী ও রাশেদ খানের দুজনেরই বিষয়ে বিতর্ক আছে। কারণ, রাব্বানীর ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে, ঠিক আছে। কিন্তু সেই ডাকসু কমিটির তো মেয়াদ শেষ। এখন কারও নাম ঘোষণা করলে সেই জিএস হয়ে গেছে, এমন না। এ ক্ষেত্রে তাদের দুজনের যেহেতু বিতর্ক আছে, তাই আমরা খালি রেখেছি।’






