ওপারে যুদ্ধের আগুন, এপারে পাম্পে আগুন
ডিজেল ৬ ডলার ছাড়িয়ে বিপাকে মার্কিন পরিবার

ডিজেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গড় প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে।
ওপারে যুদ্ধের আগুন, এপারে পাম্পে আগুন। ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি এসে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডিজেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে জাতীয় গড় প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ—গ্যালনপ্রতি ৯ ডলারের কাছাকাছি, এমনকি কিছু পাম্পে ১০ ডলারের সীমাও ছুঁয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করছেন ট্রাকচালক, কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী এবং প্রতিদিন গাড়ি ব্যবহার করা সাধারণ মানুষ। ডিজেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। আর পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পড়ছে খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের দামে।
পাম্পে পাম্পে যুদ্ধের আঁচ
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে জ্বালানি কিনতে আসা স্টেফেন আগামীর সময়কে বলেন, এত বেশি দামে শেষ কবে জ্বালানি কিনেছেন, তা তার ঠিক মনে নেই।
তার ভাষায়, এতদিন ইরান যুদ্ধের ভয়াবহতা হয়তো দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু এখন জ্বালানির দামের মাধ্যমে সেই যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি আমেরিকানদের জীবনে অনুভূত হচ্ছে। প্রতিদিন গাড়ি চালানো থেকে শুরু করে বাজার করা—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ছে।
ফিলাডেলফিয়ার প্রবাসী নাজমুল হুদাও বলছেন একই কথা। আমেরিকায় আসার পর এত বেশি জ্বালানির দাম তিনি আগে কখনো দেখেননি।
তার মতে, জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আঘাত করছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির খরচ বাড়ে না; পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দামও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটে।
ডিজেলের দামে কেন এত চাপ?
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে একসঙ্গে কয়েকটি চাপ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা, রুশ জ্বালানি রপ্তানিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তেলের দাম আরও ওপরে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের বড় ধরনের সংকট আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মজুতও স্বাভাবিকের তুলনায় নিচে রয়েছে। ফলে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হওয়ায় খুচরা বাজারে দাম দ্রুত বাড়ছে।
শুধু পাম্প নয়, বাড়ছে সবকিছুর খরচ
ডিজেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে পরিবহন খাতে। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য পরিবহনের বড় একটি অংশ ট্রাকনির্ভর। ফলে ট্রাকের জ্বালানি খরচ বেড়ে গেলে পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ে।
এর প্রভাব ধাপে ধাপে পৌঁছে যায় সুপারমার্কেট, রেস্টুরেন্ট, নির্মাণসামগ্রী, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।
কৃষকদের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে। ট্রাক্টর, হারভেস্টার ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্রে ডিজেল ব্যবহারের কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। একইভাবে নির্মাণ খাতেও ভারী যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের খরচ বাড়ছে।
অর্থাৎ পাম্পে যে মূল্যবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার প্রভাব শুধু গাড়ির ট্যাংক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকছে না। পুরো অর্থনীতির ওপর এর চাপ তৈরি হচ্ছে।
গ্যাসোলিনেও বাড়ছে চাপ
শুধু ডিজেল নয়, গ্যাসোলিনের দামও বাড়ছে। তবে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি বর্তমানে বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ এটি সরাসরি পণ্য পরিবহন ও শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত।
ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু এলাকায় গ্যালনপ্রতি ডিজেলের দাম প্রায় ১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এটি স্থানীয় কিছু পাম্পের দাম; পুরো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গড় নয়।
জাতীয় পর্যায়ে ৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া দামই এখন সাধারণ আমেরিকানদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।
ট্রাম্পের উদ্বেগ
নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি করছে এবং এর প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেলের দামেও।
ফলে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত—দুই দিকের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার চাপ এসে পড়েছে মার্কিন জ্বালানি বাজারে।
সামনে আরও চাপ?
জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় এভাবে উঁচু থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে। আর মূল্যস্ফীতি বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও আরও বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে উচ্চ সুদের হার, বাড়তি আবাসন ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে থাকা মার্কিন পরিবারগুলোর জন্য জ্বালানির এই নতুন ধাক্কা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
একজনের গাড়িতে জ্বালানি ভরার সময় শুরু হওয়া ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে পুরো সরবরাহব্যবস্থায়। ট্রাক থেকে দোকান, দোকান থেকে পরিবার—প্রতিটি ধাপে বাড়ছে খরচ।
যুদ্ধের ময়দান হাজার মাইল দূরে হলেও তার আঁচ এখন মার্কিন পাম্পে। ডিজেলের দাম ৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই যুদ্ধের খেসারত দিতে হচ্ছে আমেরিকার সাধারণ পরিবারকেই।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, গ্যাসবাডি, এএএ



