ফাঁস নথিতে নতুন বিস্ফোরক দাবি
গোপনে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি দিয়েছে রাশিয়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে নতুন উদ্বেগ। ফাঁস হওয়া নথির ভিত্তিতে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়া গোপনে ইরানকে অত্যাধুনিক সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। মস্কো ও তেহরানের এই কথিত গোপন সহযোগিতা নিয়ে সামনে এসেছে ‘সি-ফোর-থ্রি-জিরো-এল’ নামের একটি প্রকল্প, যা সফল হলে ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথম এই দাবি সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাঁস হওয়া রুশ যোগাযোগপত্র, ভ্রমণ রেকর্ড এবং সামরিক প্রযুক্তি-সংক্রান্ত পেটেন্ট বিশ্লেষণ করে এই প্রকল্পের তথ্য পাওয়া গেছে। পরে দ্য আইরিশ টাইমসসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বহু বছর ধরে চলা এই গোপন কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ইরানকে এমন প্রযুক্তি দেওয়া, যার মাধ্যমে তারা র্যামজেট ইঞ্জিনচালিত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। এই প্রযুক্তি ক্ষেপণাস্ত্রকে শব্দের কয়েকগুণ গতিতে দীর্ঘ সময় উড়তে সাহায্য করে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অস্ত্র মূলত যুদ্ধজাহাজবিরোধী হামলা এবং স্থল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি শুরু হয় ২০২৩ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলাকালেও তা অব্যাহত ছিল বলে নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক সংস্থা রসোবোরোনএক্সপোর্ট এই প্রকল্পের সমন্বয় করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল রুশ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়া।
ফাঁস হওয়া ভ্রমণ নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রুশ অস্ত্র কর্মকর্তা এবং এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়ার কয়েকজন শীর্ষ প্রকৌশলী একাধিকবার ইরান সফর করেন। পরে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও রুশ পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রুশ প্রকৌশলীরা ইরানের র্যামজেট প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন এবং ইরানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। ২০২৫ সালের মধ্যে ইরানের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত তথ্য পাওয়ার পর রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা ওই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে একাধিক প্রশ্নও পাঠিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অস্ত্র বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিনজ বলেছেন, এটি ‘রাশিয়া থেকে ইরানের কাছে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর’, যা তেহরান বহু বছর ধরে অর্জন করতে চেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি হাতে এলে পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিমানবাহী রণতরী ও বড় যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
এই সহযোগিতাকে রাশিয়া-ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন রাশিয়া ব্যবহার করেছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর মস্কো ও তেহরানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
তবে এই প্রকল্প নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ফাঁস হওয়া নথিতে সহযোগিতার প্রমাণের দাবি থাকলেও, ইরান এর মধ্যে এই প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে কি না, তার নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। এমনকি সি-ফোর-থ্রি-জিরো-এল প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ বাস্তবে শুরু হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। রাশিয়া ও ইরান দুই দেশই এ অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত সরকারি মন্তব্য করেনি। তবে দাবি সত্য হলে এটি হবে মস্কো-তেহরানের সামরিক সহযোগিতার অন্যতম বড় উদাহরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা।



