বিনাবেতনে পাঠদান ৭০ বছর

পাঠদান করছেন মো. মুছা শেখ
সকাল ৬টা। ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার মিয়াপুর গ্রামের মসজিদের বারান্দায় একে একে জড়ো হচ্ছে শিশুরা। কারও হাতে কোরআন মাজিদ, কারও হাতে আরবি শিক্ষার বই। কয়েকজন বয়স্ক মানুষও এসে বসেছেন শিক্ষকের সামনে।
মসজিদের এক কোণে বসে রয়েছেন মো. মুছা শেখ। বয়স প্রায় ৮৫ বছর। আছে শারীরিক অসুস্থতাও। তবু শিক্ষার্থীদের পড়া শুনতে তার ক্লান্তি নেই। ভুল হলে সংশোধন করে দেন। এভাবেই প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত চলে তার পাঠদান।
৭০ বছর ধরে এভাবে মসজিদের বারান্দায় বসে আরবি শিক্ষা দিয়ে আসছেন মুছা শেখ। এর বিনিময়ে কখনো বেতন নেননি তিনি। পাননি সরকারি কোনো অনুদানও।
মুছা শেখের এই দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার শুরু তার বাবার হাত ধরে। ১৯৫০ সালের দিকে তার বাবা ছিলেন মিয়াপুর গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিন। সে সময় বাবার সঙ্গে মসজিদে যেতেন। মসজিদের বারান্দায় গ্রামের শিশুদের আরবি পড়াতেন তার বাবা। পাশে বসে মুছাও বাবার কাছ থেকে আরবি শিখতেন। বাবাকে শিশুদের পড়াতে সহযোগিতা করতে শুরু করেন। সেই থেকে কেটে গেছে সাত দশক।
এখনো ফজরের নামাজের পর মসজিদের বারান্দায় বসেন তিনি। প্রতি বছর আনুমানিক ৫০-৬০ শিশু তার কাছে আরবি শিক্ষা নেয়। পাশাপাশি ৩০-৪০ জন বয়স্ক মানুষও পড়তে আসেন। কেউ কোরআন পড়া শেখেন। কেউ নামাজের প্রয়োজনীয় সুরা ও দোয়া শেখেন। মুছা শেখের কাছে বয়স কোনো বাধা নয়। তার ভাষায়, সকাল, দুপুর কিংবা রাত— যেকোনো সময় কেউ মসজিদে এসে আরবি, কোরআন শিখতে চাইলে তিনি তাকে শেখানোর চেষ্টা করেন।
পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষাও দেন তিনি। ভুল করলে শাসন করেন। প্রয়োজন হলে পরামর্শ দেন। এ কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু শিক্ষক নন, অনেকটা অভিভাবকের মতো।
বাবার মৃত্যুর পর মিয়াপুর মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব নেন মুছা শেখ। সেই দায়িত্বের পাশাপাশি চালিয়ে যান বিনাবেতনে পাঠদান। নিজের সংসারও সচ্ছল নয়। স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তার পরিবার। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নানা সংকটের মধ্য দিয়েই চলতে হয় তাকে। তারপরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা ভাবেননি তিনি।
মুছা শেখ বললেন, ‘অভাবের তাড়নায় কোনোদিন স্কুলে পড়াশোনা করতে পারিনি। বাবার কাছে আরবি পড়া শিখেছি। আমি চাই আমার এলাকার শিশুরা যেন আরবি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়।’
তার কাছে পড়তে আসা বয়স্ক শিক্ষার্থী সজল, মুকুল, বেল্লাল ও খালেক এবং শিশুশিক্ষার্থী সামিউন, রাহিম ও আলিফের ভাষ্য— এখানে আরবি ও কোরআন মাজিদ পড়ানোর পাশাপাশি দেওয়া হয় নৈতিক শিক্ষাও।
মিয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা মুরাদ পাশা বললেন, মুছা শেখ দীর্ঘদিন ধরে বিনাবেতনে এলাকার শিশুদের আরবি ও কোরআন শিক্ষা দিয়ে আসছেন। তার মতো মানুষকে সরকারি স্বীকৃতি ও সহযোগিতা দেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন রাজশাহীর ফিল্ড সুপারভাইজর মোহাম্মদ মোস্তাক আহমেদ বলেছেন, মুছা শেখের এই উদ্যোগের কথা তার জানা ছিল না। তবে বিষয় সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



