তিন রোগ চিকিৎসায় ৪০৩৯ কোটি টাকা
- তিন রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় আসছে নতুন কর্মসূচি
- বুধবার একনেকে উঠছে প্রকল্প প্রস্তাব
- ৮৭০ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে দ্য গ্লোবাল ফান্ড
- ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৭১৮ রোগী শনাক্ত করে দেওয়া হবে চিকিৎসা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি হাসপাতালগুলোয় একটা লম্বা সময় যক্ষ্মা, এইডস এবং ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বিনামূল্যে। কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও দিত এ সেবা। রোগগুলোর চিকিৎসা ব্যয়বহুল হলেও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হতো বিভিন্ন সেক্টর প্রোগ্রামের অর্থায়ন ও দাতা সংস্থার সহায়তায়। কিন্তু ২০২৪ সালের জুন মাসে চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর নানা কারণে জুলাইয়ে আর চালু না হওয়ায় গতিহীন হয়ে পড়ে স্বাস্থ্য খাত। ক্রমেই কমতে থাকে দাতা সংস্থার অর্থায়নও। ফলে অত্যাবশ্যকীয় সেবা যেমন মাঠপর্যায়ের জনবল, ওষুধ ও রি-এজেন্টের বড় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও এইডসের মতো রোগের চিকিৎসার ব্যয় গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে, যা বেশ খরুচে এবং যে চিকিৎসা নিয়মিতই করতে হয়। সাধারণ মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসার এই বাড়তি ব্যয় কমাতে আগের সেবাগুলো অব্যাহত রাখতে চায় সরকার। যার মাধ্যমে এসব খাতে দেশের যেসব অর্জন আছে সেগুলো অক্ষুণ্ন থাকবে, উপকারভোগী হবেন মানুষ। সেই সঙ্গে কমাতে চায় উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভরতাও।
আর সে কারণেই রোগ তিনটির শনাক্ত ও চিকিৎসায় নেওয়া হচ্ছে ৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকার নতুন কর্মসূচি। যার বেশিরভাগ অর্থের জোগান দেবে সরকার। শুধু দ্য গ্লোবাল ফান্ডের অনুদান হিসেবে আসবে ৮৭০ কোটি টাকা। এর আওতায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৭১৮ জন রোগী পাবেন রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসাসেবা। পাশাপাশি এই তিন রোগ ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন-সহযোগীদের ওপর নির্ভরতাও কমবে। এজন্য আগামীকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উঠছে ‘ইন্টিগ্রেটেড হেলথ সিস্টেম রেসপন্স টু ফাইট অ্যাগেইনস্ট টিবি, এইডস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি প্রকল্প। রাজধানীর সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সভা হওয়ার কথা রয়েছে। পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এই তিন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য অনেক বেশি সহায়ক হবে। এসব বিবেচনা করে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। একনেক বৈঠকে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে এইচআইভি সেবা ২৩টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জেলায় কেন্দ্রীভূত ছিল। বর্তমানে এসব জেলার বাইরেও নতুন নতুন স্থানে সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে, বাড়ছে সংক্রমণও। ২০২৫ সালে মোট ১ হাজার ৮৯১ জন নতুন শনাক্ত এইচআইভি আক্রান্তের মধ্যে ৩৩৪টি (১৭ শতাংশ) অগ্রাধিকারের বাইরের জেলা থেকে পাওয়া গেছে। দেশব্যাপী সংক্রমণের বিস্তৃতি এবং ৯৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঘাটতি বিবেচনায় ৬৪টি জেলাতেই এইডস পরীক্ষা সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৭১৮ জন রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনা।
শনাক্ত হওয়া ১০০ শতাংশ যক্ষ্মা রোগীর সংবেদনশীলতাও এ প্রকল্পে শনাক্ত করা হবে। এ ছাড়া নিবন্ধিত নতুন ও পুনঃসংক্রমিত যক্ষ্মা রোগীদের শতভাগ এইচআইভি স্ট্যাটাস নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্পের মেয়াদে এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত আনুমানিক ১৭ হাজার ৭০০ জনের মধ্যে ৮৫ শতাংশকে চিকিৎসা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সেই সঙ্গে চিকিৎসার আওতাধীন এইচআইভি রোগীর ৯৩ শতাংশের ভাইরাল লোড দমন করা হবে। ম্যালেরিয়া ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি ১ হাজারজনে বার্ষিক ম্যালেরিয়া আক্রান্তের হার ১-এর নিচে নামিয়ে আনতে কাজ করা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ও দাতা সংস্থার সহায়তায় যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও এইচআইভি বা এইডস কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে, যা এসডিজি ৩ দশমিক ৩ লক্ষ্যমাত্রার অন্তর্ভুক্ত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য জরুরি। এই তিনটি রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমানোর জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে কাজ করছে। বিগত সময়ে তিনটি রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি মূলত সেক্টর প্রোগ্রামের অর্থায়ন ও দাতা সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত হতো।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. এহসানুল হক বলেছেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশে যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া এবং এইচআইভি বা এইডস প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সমন্বিত ও টেকসই হবে। পাশাপাশি এ কাজে পর্যায়ক্রমিকভাবে উন্নয়ন-সহযোগীদের ওপর নির্ভরতা কমবে। ৩০ বছর ধরে এই তিনটি রোগ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ক্রমিকভাবে উন্নয়ন-সহযোগীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে দেশীয় অর্থায়নে এ রোগগুলোর ব্যবস্থাপনা করা গেলে তা ব্যয়সাশ্রয়ী হবে। এসব গুরুত্বের কথা বিবেচনা করেই প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।’



