জেলেনস্কিকে কেন রাশিয়ায় হামলা বন্ধ করতে বলছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স
বিশ্ব জুড়ে ডিজেলের দাম বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে এর দাম উঠেছে রেকর্ড উচ্চতায়। এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রবিবার ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেনের এসব হামলার কারণে বিশ্ব জুড়ে ডিজেলের সংকট তৈরি হচ্ছে। তার ভাষায়, এসব হামলা ‘বিশ্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্ব জুড়ে ডিজেলের সংকটের জন্য আসলেই কি ইউক্রেনের হামলা প্রধান কারণ? নাকি মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের নিজের যুদ্ধই জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে?
ট্রাম্প কী বলেছেন
আয়ারল্যান্ডে নিজের মালিকানাধীন ডুনবেগ গলফ কোর্সে অ্যামজেন আইরিশ ওপেন দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি জানান, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এ বিষয়ে তার কথা হয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘জেলেনস্কিকে একটি কাজ করতেই হবে। তাকে রাশিয়ায় ডিজেল জ্বালানির স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে হবে। অন্য অনেক লক্ষ্যবস্তু আছে। ডিজেলে হামলা করবেন না। এটা বিশ্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’
ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধই বিশ্ব জুড়ে ডিজেলের সংকটের মূল কারণ। তবে ইউক্রেনের অবস্থান ভিন্ন।
দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস অবকাঠামো বৈধ সামরিক লক্ষ্য। কারণ এই শিল্প থেকেই মস্কো অর্থ পায় এবং ইউক্রেনে যুদ্ধ চালায়।
রুশ শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার গভীরতা
ইউক্রেন কয়েক মাস ধরে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসছে। এর প্রভাব পড়েছে রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানিতে। দেশটি নিজেদের জ্বালানি রপ্তানিতেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
কে-প্লারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়ার জ্বালানি তেল রপ্তানি প্রতিদিন ৫ লাখ ৯১ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালে গড় রপ্তানি ছিল প্রতিদিন ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল।
রবিবার ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগেও ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, তারা রাশিয়ার তাতারস্তান প্রজাতন্ত্রের তানেকো তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এতে দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের হামলার জবাবে রাশিয়াও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। মূলত যুদ্ধের সম্মুখসারির কাছে থাকা পেট্রল স্টেশনগুলো লক্ষ্য করে এসব হামলা হচ্ছে। এপ্রিল থেকে হামলা আরও বেড়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪৬টি পেট্রল স্টেশনে হামলা হয়েছে।
আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প বলেছেন, ইউক্রেনের হামলা রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি শিল্পে বড় প্রভাব ফেলছে। তবে এখন পর্যন্ত এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে রাশিয়ার সাধারণ মানুষের ওপর।
গত মাসের শেষ দিকে সেন্ট পিটার্সবার্গের বেশ কয়েকটি পেট্রল স্টেশনে জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রল স্টেশনে দীর্ঘ সারিও দেখা গেছে।
বিউচ্যাম্পের মতে, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার একটি উদ্দেশ্য হলো দেশটির ভেতরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চাপ বাড়ানো।
বিশ্বে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ কতটা কমেছে
রাশিয়া এখন বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল ডিজেল সরবরাহ করছে। পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় এটি ৮১ শতাংশ কম।
রপ্তানিতে রাশিয়ার নিজস্ব বিধিনিষেধ এবং ইউক্রেনের হামলায় শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সরবরাহ কমেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্মিলিত ডিজেল রপ্তানি ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রতিদিন ১৬ লাখ ব্যারেল কম ছিল। ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব জুড়ে ডিজেল বাণিজ্যের প্রায় ৪৫ শতাংশের সঙ্গে এ দেশগুলো যুক্ত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম কত বেড়েছে
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। রবিবার দেশটিতে প্রতি গ্যালনের গড় দাম ছিল প্রায় ৬ ডলার ২০ সেন্ট। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে সাধারণ পেট্রলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। প্রতি গ্যালনের দাম দাঁড়িয়েছে ৪ ডলার ৩১ সেন্ট।
ডিজেল শুধু গাড়িতে নয়, জাহাজ, ট্রেন ও ট্রাকে ব্যবহৃত হয়। ফলে এর দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের দামেও।
যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। জ্বালানির বাড়তি দাম তাই ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে। অর্থনীতি সামলানোর বিষয়ে ট্রাম্পের প্রতি মানুষের আস্থাও কমেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের সাম্প্রতিক এক জরিপে এ বিষয়ে তার অনুমোদনের হার মাত্র ১৭ শতাংশ।
ডিজেলের দাম এত বাড়ছে কেন
বিউচ্যাম্পের মতে, ইউক্রেনের হামলা বড় সংকটের একটি ‘ছোট অংশ’ মাত্র।
তিনি বলেছেন, ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানি করছে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ডিজেল সংকটের পেছনে রাশিয়ার সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব থাকলেও সেটিই একমাত্র কারণ নয়।
তার মতে, ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনকার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম ছিল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানই তেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ বলে মনে করেন তিনি। তার আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আইইএও প্রায় একই কথা বলেছে। সংস্থাটির মতে, রাশিয়ার শোধনাগারে ক্ষতি এবং ইউক্রেনের হামলার পর জ্বালানি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তবে এর আগে থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি করেছে।
ইরান যুদ্ধ কতটা বড় ধাক্কা
হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের কারণে এই পথ দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ছিল হরমুজের বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু বৃহস্পতিবার ড্রোন হামলার পর সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। হামলাটি ইরাক থেকে চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর বাইরে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার তেল শোধনাগারও যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে শুধু অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নয়, সেই তেল থেকে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি তৈরির ক্ষমতাও কমেছে।
বিউচ্যাম্প বলেছেন, ইউক্রেনের হামলা বন্ধ হলে স্বল্পমেয়াদে ডিজেলের দাম কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যা থেকে গেলে সেই দাম দ্রুত আবার বেড়ে যাবে।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়নের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগও মনে করেন, ইউক্রেনের হামলা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কার কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধ।
ক্রিগের মতে, ‘ইরান যুদ্ধই বিশ্ব জুড়ে ডিজেলের সরবরাহে বড় কাঠামোগত ধাক্কা। ইউক্রেনের শোধনাগারে হামলা গুরুত্বপূর্ণ বাড়তি চাপ তৈরি করছে। কিন্তু এর ওপর রয়েছে উপসাগরকেন্দ্রিক আরও বড় সংকট।’
তার ভাষায়, ‘এই দুই সংকট একে অপরের বিকল্প ব্যাখ্যা নয়। বরং দুটিই একসঙ্গে কাজ করছে। এ কারণেই ডিজেলের বাজার এতটা অস্থির হয়ে উঠেছে।’
তাহলে ট্রাম্পের সতর্কবার্তার কী মানে
বিশ্বের ডিজেল সংকটে ইউক্রেনের হামলার ভূমিকা আছে। রাশিয়ার শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি কমেছে। এতে বিশ্ববাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের বড় কারণ একসঙ্গে একাধিক যুদ্ধ। ইউক্রেনের হামলা রাশিয়ার সরবরাহ কমিয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সৌদির বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থাও হামলার শিকার হয়েছে।
অর্থাৎ ডিজেলের বর্তমান সংকটের জন্য শুধু ইউক্রেনকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও যোগ হয়েছে। আর এই দুই সংকট একসঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
সূত্র : আল জাজিরা








