গরিবের চিকিৎসায় নিবেদিত হাফিজুর

চিকিৎসার পর রোগীর খোঁজখবর নিচ্ছেন হাফিজুর রহমান
২০১৬ সালে শীতের এক সন্ধ্যায় সৈয়দপুর শহরের থানার মোড়ের একটি চায়ের দোকানে বসেছিলেন ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান। হঠাৎ এক বৃদ্ধা এসে চিকিৎসাপত্র দেখিয়ে বললেন, ‘বাবা আমি অসুস্থ, ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই, কিছু টাকা দিলে ওষুধ কিনে খেতাম। অসহায় ওই নারীর কথাগুলো গভীরভাবে নাড়া দেয় হাফিজুরকে। তিনি ভাবেন, শুধু এই বৃদ্ধাই নন, অর্থের অভাবে এমন অনেকেই ওষুধ কিনতে পারেন না; তাদের জন্য কিছু করা যায় কি না।
ওই বছরের জানুয়ারিতে এ নিয়ে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেন হাফিজুর রহমান (৪০)। গঠন করেন ‘গরিব চিকিৎসাসেবা’ নামের সামাজিক সংগঠন। মাত্র ২০ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু। প্রত্যেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে গড়ে তোলেন ২০ হাজার টাকার তহবিল। বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য ৯৫ জন। রয়েছে ১৩ সদস্যের কার্যনির্বাহী পরিষদ এবং পাঁচ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ। উপদেষ্টা পরিষদের চারজনই প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক।
সংগঠনটির কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে শুরু থেকেই নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন প্রধান উদ্যোক্তা ও সভাপতি হাফিজুর রহমান। অসহায় রোগীর ডাক্তার দেখানো, ওষুধের ব্যবস্থা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের রংপুর কিংবা ঢাকায় পাঠানো পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত থাকেন তিনি।
সংগঠনটি প্রতি বছর অন্তত দুটি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করে। মাঠপর্যায়ে সংগঠনের সদস্যরা অসহায় রোগীদের শনাক্ত করেন। পরে তাদের স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ১০ বছরে প্রায় এক হাজার অসহায় রোগীকে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে সংগঠনটি। চিকিৎসাসেবা ছাড়াও রক্তদান, রমজান মাসে ইফতার বিতরণ, গরিব দুস্থদের মধ্যে খাদ্য সহায়তা, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে সংগঠনটি। সৈয়দপুর পৌরসভা ও উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন জুড়ে সংগঠনটির কার্যক্রম চলছে।
সৈয়দপুর শহরের মিস্ত্রিপাড়ার ভ্যানচালক সাহেদ আলী গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। তিনি বললেন, ‘দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার খরচ চালানো আমার পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। গরিব চিকিৎসাসেবা থেকে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা সহায়তা ও ওষুধ পেয়েছি। এখন আমি সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরেছি।’
শহরের চাঁদনগর নয়াটোলায় বসবাস করেন হাফিজুর রহমান। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার।
হাফিজুরের ভাষ্য, ‘অর্থের অভাবে যেন কেউ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, এটাই আমার লক্ষ্য। গরিব চিকিৎসাসেবার সদস্যদের চাঁদা, জাকাত ও বিভিন্ন অনুদানের মাধ্যমে সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর এবং প্রয়োজন হলে ঢাকায় পাঠানো হয়। আমি একা নই, সংগঠনের অন্যান্য সদস্য এবং উপদেষ্টা চিকিৎসকদের সহযোগিতায় এই কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা আহমেদ বলেছেন, প্রতিষ্ঠাতা হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে গরিব চিকিৎসাসেবা সংগঠনটি এগিয়ে যাচ্ছে। তার নেতৃত্বে ১০ বছরে এক হাজার অসহায় রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
সৈয়দপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জোবায়দুল ইসলাম মিন্টু বলেছেন, সরকারি সেবার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে এ ধরনের সামাজিক উদ্যোগ অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়ায়। হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে সংগঠনটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে উপকৃত হবে এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষ।



