১০ লাখ কোটির অর্থনীতির রূপরেখা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক লাখ কোটি (এক ট্রিলিয়ন) ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রণীত ‘কৌশলগত রূপরেখায় (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১)’ সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে। দীর্ঘদিনের দাবির পর অবশেষে চট্টগ্রামকে দেশের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে একটি সমন্বিত ‘চট্টগ্রাম ক্লাস্টার মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে বে টার্মিনাল নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা, যানজট নিরসনে মনোরেল এবং চিকিৎসায় বিদেশমুখিতা কমাতে বিশ্বমানের ‘মেডিকেল ও ওয়েলনেস হাব’ নির্মাণের মতো মেগা প্রকল্পগুলো এ রূপরেখায় স্থান পেয়েছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর গত মঙ্গলবার রাতে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বিনিয়োগ অনুমোদন এবং সেবা প্রদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতায়ন করা হবে। এর ফলে ঢাকাকেন্দ্রিক লবিং বা তদবিরের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে। চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা আমাদের। এরই মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কনটেইনার পরিচালনাকারী অপারেটরকে লালদিয়া টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের এ কৌশলগত রূপরেখার অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, উত্তরাঞ্চল, হাওর ও উপকূলীয় এলাকার মতো অঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হবে, যাতে দেশের প্রত্যেক মানুষ এ উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে।’
চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডরগুলোকে যুক্ত করে ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি)’ বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রকাশিত এ রূপরেখায়। এ বিশাল রূপরেখা বাস্তবায়নে আনুমানিক ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। এর মধ্যে আগামী পাঁচ বছরে (অর্থবছর ২০২৭-৩১) স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার প্রথম ধাপের জন্য প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বা ৫ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিপুল অর্থায়নের জন্য সরকার শুধু নিজস্ব বাজেটের ওপর নির্ভর করতে চায় না। মূল অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি অর্থায়ন ও গ্যারান্টি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর বড় অংশ বাস্তবায়নের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), রেয়াতি বিদেশি ঋণ, ল্যান্ড ভ্যালু ফি, গ্রিন বাংলাদেশ বন্ড এবং মিউনিসিপ্যাল বন্ডের মাধ্যমে।
বন্দর ও যোগাযোগ খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: ২০২৭ সালের মধ্যেই ‘চট্টগ্রাম ক্লাস্টার মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়নের কাজ শুরুর সময়সীমা ধরা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বে টার্মিনাল, লালদিয়া এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ অর্থবছর ২০২৭-৩১ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বে টার্মিনালের ব্রেকওয়াটার এবং নেভিগেশনাল চ্যানেল তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।
সড়ক ও রেল যোগাযোগের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ধীরগতির যানবাহনের লেনসহ (এসএমভিটি) ছয় লেনে উন্নীত করা এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম ডাবল-ট্র্যাক রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০২৭-৩০ সালের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। শহরের যানজট নিরসনে উচ্চযাত্রী চাহিদাসম্পন্ন করিডরগুলোতে মনোরেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ যাত্রীবাহী ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানি, শিল্প ও ব্লু-ইকোনমিতে রূপান্তর: মহেশখালীকে জ্বালানিনির্ভর শিল্পের জন্য, মাতারবাড়ীকে বন্দরভিত্তিক লজিস্টিকসের জন্য এবং চট্টগ্রাম-মিরসরাইকে বহুমুখী উৎপাদন শিল্পের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থবছর ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে ‘মহেশখালী-মাতারবাড়ী এনার্জি সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’-এর আওতায় এলএনজি টার্মিনাল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্রিড শক্তিশালীকরণ এবং স্মার্ট সাবস্টেশন তৈরির রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে মহেশখালী-বাখরাবাদ ২৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিকে আধুনিকীকরণের অথবা একটি নতুন অপরিশোধিত তেল শোধনাগার নির্মাণের বিকল্প রাখা হয়েছে।
চিকিৎসায় বিদেশমুখিতা রোধে ‘মেডিকেল হাব’: দেশের মানুষের চিকিৎসায় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলকে একটি সমন্বিত ‘মেডিকেল ও ওয়েলনেস হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অর্থবছর ২০২৮-৩১ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের আওতায় টারশিয়ারি হাসপাতাল, ট্রমা ও ইমার্জেন্সি কেয়ার এবং ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্ম তৈরির কথা বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘আরবান ওয়াটারলগিং অ্যান্ড ফ্লাড ড্রেনেজ ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম’ হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কারা কী বলছেন: চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেছেন, ‘সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি ও নৌপরিবহন-সংশ্লিষ্ট যত মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর বা পরিদপ্তর আছে, সেগুলোর সদর দপ্তর চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা জরুরি।’
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক সিকান্দার খান বলেছেন, ‘দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা যেন প্রতিটি অনুমোদনের জন্য ঢাকামুখী না হয়ে চট্টগ্রামেই এক ছাতার নিচে সব ধরনের দাপ্তরিক সেবা পান, তা নিশ্চিত করা জরুরি।’



