মোবাইল ফোনের মুঠোয় বন্দি হবেন না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মোবাইল ফোন আমাদের সময় বাঁচানোর কথা ছিল। কথা ছিল যোগাযোগকে দ্রুত করার। কাজ আরও সহজ ও গতিশীল করার কথা ছিল। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে কখনো কখনো সেই মোবাইল ফোনই কি আমাদের সময়, মনোযোগ ও শৃঙ্খলা কেড়ে নিচ্ছে? প্রশ্নটি এখন আর নিছক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের পেশাগত সংস্কৃতির প্রশ্ন। অফিসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে কি যাবে না, এই বিতর্কের কোনো অর্থ নেই। কারণ বাস্তবতা হলো, আধুনিক কর্মক্ষেত্রে মোবাইল ফোন প্রয়োজনীয়। সমস্যা ফোনে নয়, সমস্যাটি হলো ফোনের প্রতি আমাদের আচরণে। একটি জরুরি কল এবং একটি অপ্রয়োজনীয় কল এক জিনিস নয়। অফিসের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত ব্যস্ততাও এক নয়। অথচ অনেক সময় আমরা এই মৌলিক পার্থক্যটিই ভুলে যাই। বিশেষ করে সভা বা মিটিংয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি সভা মানে শুধু কয়েকজন মানুষের একই ঘরে বসা নয়। সেখানে সময় ব্যয় হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, মতামত দেওয়া হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং কখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি হয়। সেই সভায় একজন অংশগ্রহণকারী যদি বারবার মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে— তিনি কি সত্যিই সভায় উপস্থিত, নাকি শুধু তার চেয়ারটি উপস্থিত?
সম্প্রতি বাগেরহাটে একটি সভায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি এ প্রসঙ্গে নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য চলাকালে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন বারবার মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন এবং ফোনে কথা বলার জন্য সভাস্থল থেকে বাইরে যাচ্ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ফোন বন্ধ করে সভায় মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ ঘটনা কোনো ব্যক্তিকে হেয় করার উপাদান হিসেবে দেখলে মূল শিক্ষাটিই হারিয়ে যাবে। বরং ঘটনাটি আমাদের একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়— আমরা কি কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে?
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে জরুরি ফোন আসতেই পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বা জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন ফোন আসা অস্বাভাবিক নয়। তাই ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্ধ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু জরুরি যোগাযোগের সুযোগ থাকা আর প্রতিটি ফোনকে জরুরি মনে করা এক বিষয় নয়। দায়িত্বশীলতার জায়গাটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি সভায় মোবাইল ফোনের কারণে বারবার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ক্ষতিটা শুধু একজনের হয় না। বক্তার বক্তব্যের প্রতি অসম্মান তৈরি হয়, অন্য অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগ নষ্ট হয় এবং সভার গাম্ভীর্যও ক্ষুণ্ন হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এতে একটি ভুল সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে যেন সভায় উপস্থিত থেকেও নিজের ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় ডুবে থাকা স্বাভাবিক। আমাদের কর্মসংস্কৃতিতে এই জায়গাটিই নতুন করে ভাবা দরকার। অফিসে সময়মতো উপস্থিত হওয়া যেমন পেশাদারিত্ব, তেমনি সভায় উপস্থিত থেকে সভার প্রতি মনোযোগী থাকাও পেশাদারিত্ব। অফিসের পোশাক, পরিচয়পত্র, সময়ানুবর্তিতা কিংবা আনুষ্ঠানিক আচরণ নিয়ে আমরা যতটা সচেতন, মোবাইল ফোন ব্যবহারের শিষ্টাচার নিয়েও ততটাই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্ন হলো, এর সমাধান কী? শুধু ‘মোবাইল ফোন বন্ধ রাখুন’ বললেই কি সমস্যার সমাধান হবে? সম্ভবত নয়। প্রয়োজন একটি স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত মোবাইল ফোন ব্যবহারের সংস্কৃতি। সভায় প্রবেশের আগে ফোন সাইলেন্ট রাখা, জরুরি কলের সম্ভাবনা থাকলে আগে জানানো, প্রয়োজন হলে সভার বাইরে গিয়ে কথা বলা এবং ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এড়িয়ে চলা এসব খুব সাধারণ নিয়ম। কিন্তু সাধারণ নিয়মই অনেক সময় একটি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বের বড় পরিচয় হয়ে ওঠে। এখানে কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব আছে। শুধু কর্মীদের শাসন করলেই হবে না; অফিসে মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে পরিষ্কার নীতিমালা থাকতে হবে। কোন পরিস্থিতিতে ফোন ব্যবহার করা যাবে, কোন ক্ষেত্রে সভা থেকে বের হয়ে কথা বলা গ্রহণযোগ্য এবং অফিসের গোপনীয় তথ্য মোবাইল ফোনে কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে, এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার। নিয়ম যেমন থাকতে হবে, তেমনি জরুরি পরিস্থিতির জন্য যুক্তিসংগত ব্যতিক্রমের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় আমরা কি কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে?
আর কর্মীদের মনে রাখতে হবে, মোবাইল ফোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলেও অফিসের সময় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সময় নয়। কর্মঘণ্টায় আমরা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করি। ফলে সেই সময়ে ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহারের স্বাধীনতারও একটি সীমা রয়েছে। স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তার সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকে। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ, মোবাইল ফোন শুধু মনোযোগ নষ্ট করে না; এটি তথ্যের নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। সভায় গোপন নথির ছবি তোলা, সংবেদনশীল আলোচনা রেকর্ড করা বা অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য বাইরে পাঠানো গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। ফলে মোবাইল ফোন ম্যানারিজম আসলে শুধু ভদ্রতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে পেশাগত নৈতিকতা, তথ্য-নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও জড়িত। প্রযুক্তির যুগে আমরা মোবাইলবিহীন কর্মক্ষেত্র চাই না। আমরা চাই সচেতন মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী কর্মক্ষেত্র।
বাগেরহাটের ঘটনাটি তাই একজন ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনার চেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে— সভায় আমরা কেন যাই; শুধু উপস্থিতির সংখ্যা পূরণ করতে, নাকি আলোচনায় অংশ নিতে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে মোবাইল ফোনের পর্দা থেকে চোখ তুলে সভার মানুষের দিকে তাকানোও পেশাগত দায়িত্বের অংশ। শেষ পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা বড় কোনো ঘোষণা দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় ছোট ছোট অভ্যাসে। সময়মতো আসা, অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা, সভার প্রতি সম্মান দেখানো এবং প্রয়োজনের বাইরে মোবাইল ফোনকে পাশে রাখা। মোবাইল ফোন আমাদের কাজের সহায়ক হোক, কাজের নিয়ন্ত্রক নয়। প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় থাকুক; কিন্তু আমাদের মনোযোগ যেন প্রযুক্তির মুঠোয় চলে না যায়।
লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক



