সিনিয়রের সামনে সিগারেট জ্বালানোয় তানিমকে হত্যা করা হয়
- হত্যার সন্দেহ এড়াতে হাসপাতালে দেখতে যায় চার শিশু
- একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, চারজনের বিরুদ্ধে দোষীপত্র

নিহত তানিম
আরমানিটোলার আহমেদ বাওয়ানী একাডেমির শিক্ষার্থী ছিলেন মোরশেদ আলম তানিম। গত বছরের ৩০ জুন রাজধানীর চকবাজার থানাধীন এলাকায় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসা দেওয়া হলেও তানিমকে বাঁচানো যায়নি, হাসপাতালেই মারা যান। ওই সময় দাবি করা হয়, মোবাইল ছিনিয়ে নিতে ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাত করেছে। তবে বছর পেরোতেই তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলাটি তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা পড়েছে। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুনিয়র হয়ে সিনিয়রের সামনে সিগারেট জ্বালানোয় তানিমকে হত্যা করা হয়।
চকবাজার মডেল থানার উপপরিদর্শক রাজু আহমেদ জানিয়েছেন, এই মামলাটি তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। মামলাটির অভিযোগ প্রমাণে ১৯ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তারা আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করবেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ভিকটিম তানিম তার মাকে বলছিল কারা তাকে ছুরিকাঘাত করেছে। কিন্তু তারা ভয়ে সবকিছু লুকিয়ে যান। এমনকি মামলাও করতে রাজি হননি। পরে কারা তাকে প্রথমে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। সেই অনুসন্ধান করতে গিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তাদের জবানবন্দি ও তদন্তে সিগারেট জ্বালানোর বিষয়টি সামনে আসে। এ বিষয়ে কথা বলতে নিহতের বাবা ফিরোজ আলম আবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাকে পাওয়া যায়নি।
নিহত মোরশেদ আলম তানিমের দাফন শেষে তার পরিবার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান। তবে পরে কোনো অভিযোগ না করায় চকবাজার মডেল থানার উপপরিদর্শক মো. মানিক উদ্দিন বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে গত ২৮ আগস্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চকবাজার মডেল থানার উপপরিদর্শক রাজু আহমেদ আসামি মো. সিফাত ওরফে রিগ্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। একই সঙ্গে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত চার শিশুর বিরুদ্ধে দোষীপত্র জমা দেন। দোষীপত্রে রয়েছে মো. সায়েম হোসেন, মো. জাহিদ ইসলাম, মোস্তাকিম আহম্মেদ সাফিন ও মো. অনিক। এদের মধ্যে সায়েম, জাহিদ ও অনিক দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।
সিগারেট জ্বালানোয় তানিমকে হত্যার পরিকল্পনা
আসামি সিফাত ও আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশু সায়েম, জাহিদ, সাফিন ও অনিক মামলার ভিকটিম মোরশেদ আলম তানিমের পূর্বপরিচিত। পূর্ব থেকেই তাদের সঙ্গে ভিকটিম মোরশেদ আলম তানিমের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিক্রয় করে দেওয়া নিয়ে ঝামেলা চলে আসছিল। ২০২৫ সালের ৩০ জুন রাত ১২টার দিকে তানিম হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে মাতম শেষ করে আসিফুর রহমান দাউদ, আরাফাত হোসেন রাফি ও ধলুদের সঙ্গে বাসায় ফেরার জন্য দালানের পেছনের দক্ষিণ দিকের গেট দিয়ে বের হন। এ সময় তার পেছন পেছন একই গেট দিয়ে সিফাত, জাহিদ, সাফিন ও অনিক বের হয়।
তানিম হোসেনি দালান থেকে বের হয়ে কাবিন নামক কাবাবের দোকানের সামনে গিয়ে সিগারেট জ্বালায়। তখন সায়েম তার সিগারেট জ্বালানো দেখেন। পরে তিনি সিফাতসহ সবাইকে তানিমের সিগারেট জ্বালানোর কথা বলেন। তখন মো. সিফাত তার সহযোগীদেরকে বলে তানিমের কত বড় সাহস যে, জুনিয়র হয়ে সিনিয়রের সামনে সিগারেট জ্বালায়; সে একটা বেয়াদব। ওকে আজ শিক্ষা দেব। এরপর সিফাত ও তার সহযোগীরা তানিমকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
হত্যার সন্দেহ এড়াতে হাসপাতালে তানিমকে দেখতে যায় চার শিশু
ভিকটিম তানিম সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে তার সঙ্গে থাকা বন্ধুদের থেকে কিছুটা পেছনে পড়ে যায়। তানিম চকবাজার মডেল থানার নাজিম উদ্দিন রোডস্থ মক্কু শাহ মাজারের নিকট পৌঁছালে পূর্বশত্রুতার জের ধরে সিফাত ও তার সহযোগীরা তাকে ঘিরে ধরেন। তখন সিফাত হত্যার উদ্দেশে ধারালো চাকু দিয়ে তাকে আঘাত করে। তানিমের চিৎকারে তার বন্ধু আসিফুর রহমান দাউদ, আরাফাত হোসেন রাফি ও ধলু এগিয়ে আসেন। তখন সিফাত দৌড়ে পালিয়ে যান।
তানিমকে উদ্ধার করে প্রথমে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে তানিমকে হত্যায় যাতে সন্দেহ না করে সেই কারণে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত সায়েম হোসেন, জাহিদ ইসলাম, মোস্তাকিম আহম্মেদ সাফিন ও অনিক তাকে দেখতে মিটফোর্ড হাসপাতালে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসা শেষে ১ জুলাই তানিমকে বাসায় নেওয়া হয়। তবে ওইদিন বিকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে ফের তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানা যায়, তার খাদ্যনালী কেটে গেছে। একই দিন রাত ১১টায় তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। অপারেশন শেষে ২ জুলাই ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তানিম মারা যান।




